হাওর অঞ্চলে পর্যটন বিকাশে ১৭ প্রস্তাবনা, সোয়া ৭ কোটি টাকা বরাদ্দ
হুমায়ূন রশিদ চৌধূরী, সিলেটে অফিস ও মো. বুরহান উদ্দিন, সুনামগঞ্জ
সিলেটের প্রকৃতি যেন সৌন্দর্যের পেখম মেলেছে। সবুজ চা-বাগান, পাহাড়-টিলা, লতাগুল্ম, হাওর-নদীর স্বচ্ছ পানিতে নৌযান, পাহাড়-বৃক্ষের প্রতিবিম্ব—সে এক অপরূপ দৃশ্য। মেঘ-পাহাড়ের কূলে হাকালুকি ও টাঙ্গুয়ার হাওর যেন এক স্বপ্নপুরী। স্ফটিক স্বচ্ছ জলে জীববৈচিত্র্যের জলকেলির দৃশ্য মন পাগল করে তোলে। এদিকে করোনা ভাইরাসের দীর্ঘ বাধা উতরে ভ্রমণপিপষুরা সুরক্ষা বজায় রেখেই সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে লুটোপুটি খাচ্ছেন বেশ আগে থেকেই।
অন্যদিকে প্রায় সাড়ে সাত মাস বন্ধ থাকার পর পর্যটকদের জন্য আবারও রবিবার থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সিলেটের ইকোপার্ক, মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া, মাধবকুণ্ড, হবিগঞ্জের সাতছড়িতে প্রবেশ করতে অনুমতি দিয়েছে বন বিভাগ। আর এতে যেন প্রাণ ফিরে এসেছে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে।
এর আগে সিলেট জেলা প্রশাসন ২৫ শর্তে সিলেটের বিনোদনকেন্দ্রগুলো খোলার অনুমতি দেয়। সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে রাত যাপনে নিষেধ রয়েছে। করোনাকালে ঘরে বন্দিজীবনে মানুষ যেন হাঁফিয়ে উঠেছে। তাই মানুষ ছুটে চলেছে জাফলং, বিছনাকান্দি, রাতারগুল, পান্থুমাই, টাঙ্গুয়া, হাকালুকির হাওর, শহিদ সিরাজ লেক, নিলাদ্রী, শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানসহ নানা পর্যটন স্পটে। উঁচু-নিচু টিলার সবুজ চা-বাগানের ফাঁকে ঝিরঝির শব্দে বয়ে চলা পাহাড়ি ছড়া, সাদা কাশফুলের দৃশ্য মন পাগাল করে তোলে। হাওরপ্রধান সুনামগঞ্জের দৃষ্টিনন্দন এলাকাগুলোতে পর্যটকেরা ঘুরছেন কার্তিকের রোদেলা দিনে।
দ্য সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, সিলেটের পর্যটন খাতে বরাদ্দ দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. মাহবুব আলীসহ সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে চেম্বার সভাপতি আবু তাহের মো. শোয়েব বিছনাকান্দি পর্যটন স্পটে স্যানিটেশন ও পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ এবং শিশু ও মহিলাদের জন্য ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টার স্থাপনের প্রস্তাব করেছেন। বিছনাকান্দিকে আকর্ষণীয় করে তুলতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় রেস্তোরাঁ, কটেজ ও পর্যটকদের বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বিচবেড স্থাপন এবং রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট স্পটের নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন। তিনি একই সঙ্গে ট্যুরিস্ট পুলিশ নিয়োগের প্রস্তাব করেছেন।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জানালেন, মুক্তিযুদ্ধ উপত্যকা, মরমি সাধক রাধারমণ, হাছন রাজা, শাহ আব্দুল করিম, দুরবিন শাহসহ অসংখ্য বাউল কবির পাদপীঠ এই জেলায়। শতাধিক রূপ-সৌন্দের্যের হাওর, শহিদ সিরাজ লেক, বারেকের টিলা ও শিমূলবাগানকে সম্ভাবনাময় পর্যটন জোন তৈরির জন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় ও আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটকদের কাছে এই এলাকাকে ব্র্যান্ডিং করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়। তিনি বলেন, মুজিববর্ষেই সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের লক্ষ্য সুনামগঞ্জের পর্যটনকে ব্র্যান্ডিং করা।
হাওর ও পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা বলেন, পর্যটকদের প্রথম পছন্দের স্থান টাঙ্গুয়ার হাওর। এখন আবার প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক আসছেন। সড়ক যোগাযোগব্যবস্থারও উন্নতি হলে এই এলাকায় আরো পর্যটক বাড়বে।
১৭ প্রস্তাবনা :হাওর পর্যটনে মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৭টি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ। তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মহিবুল হকের নিকট প্রস্তাবগুলো পেশ করেছেন বলে জানান। এগুলো বাস্তবায়িত হলে এখনকার অর্থনীতি ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছে যাবে বলে মনে করেন জেলা প্রশাসক।
প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে রয়েছে :হাওরাঞ্চলে পর্যটন বিকাশের জন্য অভ্যন্তরীণ নৌযোগাযোগ বৃদ্ধি। হাওরাঞ্চলের উপজেলাসমূহের সড়কযোগাযোগ বৃদ্ধি। সুনামগঞ্জে ট্যুরিজম বোর্ডর অফিস স্থাপন এবং ট্যুরিস্ট গাইড তৈরির জন্য উদ্যোক্তাদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা। ট্যুরিস্ট পুলিশ ও নৌ পুলিশ নিয়োগ। টেকেরঘাট নিলাদ্রী ডিসি পার্ক, বারেকের টিলায় উচ্চ ও মধ্যম মানের হোটেল, মোটেল, কটেজ নির্মাণ। পর্যটকদের জন্য মোটেল নির্মাণ। ইকোট্যুরিজমভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণ। টাঙ্গুয়ার পাড়ের মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ইত্যাদি।
