মৌলভীবাজারে প্রকৃতি বিনাশী গাছের বনায়নে কৃষির ক্ষতি

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২০, ২৩:০০

মৌলভীবাজার জেলায় প্রকৃতি বিনাশী আকাশমনি, ম্যানজিয়াম, রাবার, ইউক্যালিপটাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির ভিনদেশি গাছের বনায়ন কৃষি ও প্রাণবৈচিত্র্যে মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনছে। দ্রুত বর্ধনশীল ও দৃষ্টিনন্দন এসব গাছের কাঠ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় রাস্তার দুই ধারে, বাড়িঘরের আশপাশে, বনের টিলায় এগুলো লাগানো হচ্ছে।

জানা যায়, আকাশমনি, ম্যানজিয়াম প্রজাতির বিদেশি গাছগুলো দ্রুত বর্ধনশীল। অধিক মুনাফা লাভের আশায় গত কয়েক যুগ ধরে এসব গাছ দিয়ে বনায়নের হিড়িক শুরু হয়। সিলেট বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সামাজিক বনায়নে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ সব ক্ষতিকর গাছ রোপণ করা হচ্ছে। এছাড়া রাস্তার দুই ধারে সামাজিক বনায়নের ক্ষেত্রে এবং ব্যক্তি উদ্যোগেও এসব ক্ষতিকর বিদেশি গাছ লাগানো হচ্ছে। এতে কৃষিসহ পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। রাস্তার পাশে লাগানো এসব গাছের ছায়ায় পড়ে ধানগাছে বিভিন্ন রোগ ও পোকার আক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জমিতে ধানগাছ মরে যাচ্ছে। অন্যদিকে চা-বাগান ও চা-গাছের টিলাভূমিতে ক্ষতিকর রাবার গাছের চাষাবাদ চলছে। এসব ক্ষতিকর গাছের ভিড়ে দেশীয় প্রজাতির মূল্যবান কাঠ ও ফলের গাছ এবং ঔষধি বৃক্ষ রোপণের বিষয়টি প্রায় উপেক্ষিত হয়ে পড়েছে।

কমলগঞ্জের তোয়াবুর রহমান তবারক, শেরওয়ান আলী, মোবাশ্বির         আলীসহ কয়েকজন কৃষক জানান, আকাশমনি, ম্যানজিয়ামসহ এসব গাছগাছালি চাষাবাদ কৃষিজমি বিনষ্ট করে। মত্স্য খামারের আশপাশে এসব গাছ থাকলে মত্স্য উত্পাদনেও ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এসব গাছের ছায়ায় ধানগাছ মরে যায়। তখন ধানগাছ কেটে গরু ও মহিষকে খাওয়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। বিশেষ করে আকাশি গাছের ছায়ায় ধানগাছ কিংবা অন্য কোনো ফসল চাষ করা সম্ভব হয় না। এই গাছগুলো আশপাশের দেশীয় প্রজাতির অন্য গাছগাছালি মেরে ফেলে।

গবেষকদের মতে, এই গাছগুলো স্থানীয় প্রজাতির গাছগাছালির জায়গা দখল করে সেগুলোকে বিপন্ন করে তোলে। মৌলভীবাজারের বন্যপ্রাণী বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জন কর্মকর্তা জানান, আগ্রাসি প্রজাতির গাছগাছালি পশু পাখির খাবার তৈরি করে না এবং এগুলোর বিস্তারে অন্য গাছের সালোক সংশ্লেষণ-প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। যে কারণে জীববৈচিত্র্যের জন্য আগ্রাসি প্রজাতির গাছ খুবই ক্ষতিকর।

প্রকৃতিবিদ দ্বিজেন শর্মা তার এক লেখায় বলেছিলেন, ‘ইউক্যালিপটাস, শিশু, মেহগনি, রেইনট্রি গাছগুলো অত্যধিক পানি শোষণ করে জমি শুকিয়ে ফেলে। শিকড় গভীরে প্রোথিত না হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আশপাশে অন্য গাছপালা জন্মাতে দেয় না।’ তার মতে ‘আমাদের দেশে দরকার জলজ উদ্ভিদ। এখানে জলজ জায়গা বেশি। শিকড় গভীরে প্রোথিত হয়। ফলে পাশে অন্যকিছুও জন্মাতে পারে।’ 

কমলগঞ্জের রাজকান্দি বনরেঞ্জ কর্মকর্তা আবু তাহের আকাশমনি গাছের ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করে বলেন, এখন এসব গাছ রোপণ এবং সরকারি নার্সারিগুলোতে আকাশমনি, ম্যানজিয়াম গাছের চারা উত্পাদন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই গাছগুলোর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন মহলেও আলোচনা হচ্ছে এবং এগুলো বনায়নে সবাইকে নিরুত্সাহিত করা হচ্ছে।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্তি উপ-পরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) মো. শামসুদ্দীন আহমদ জানান, আকাশি, ইউক্যালিপটাস গাছের ছায়ায় ধানগাছে পাতা মোড়ানো রোগ হয় এবং বিভিন্ন ছত্রাকে আক্রান্ত হয় গাছ।