যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর পেনসিলভেনিয়া ও নেভাদায় পপুলার ভোটে জিতে ২৯০টি ইলেকটোরাল ভোটে জয় পেয়ে হোয়াইট হাউজের নেতৃত্বে চলে গেলেন জো বাইডেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হার না মানার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে ভোটের ফলের অপেক্ষার পর নতুন করে অচলাবস্থার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এতে কিছুই আসে যায় না
যুক্তরাষ্ট্রে আইন সম্পর্কে যারা জানেন সেই বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট যদি নির্বাচনে পরাজিত হন এবং সেই ফলাফল নির্বাচনি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে, তাহলে তিনি পরাজয় স্বীকার করলেন কি করলেন না তাতে কিছু আসে যায় না। নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী পরাজয় স্বীকার করেন জয়ী প্রার্থীকে একটা ফোন করে এবং সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতার মাধ্যমে। নিকট অতীতে হিলারি ক্লিনটন, জন ম্যাককেইন, আল গোর, জর্জ এইচ বুশ সবাই তাই করেছেন। অবশ্য হিলারি ক্লিনটন নির্বাচনে ট্রাম্পের কাছে হারার পর তখনকার ভাইস প্রেসিডেন্টকে প্রথম দিকে পরামর্শ দিয়েছিলেন ফলাফল খুব অল্প ব্যবধানের হলে পরাজয় স্বীকার না করে ঘটনা কোন দিকে যায় তা দেখতে। তবে এই পরাজয় স্বীকার করা একটা আনুষ্ঠানিকতা বা রাজনৈতিক সৌজন্য মাত্র। এর আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।
ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউজ থেকে বের করে দেওয়া হবে?
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনি ফল মানবেন কি না, সেই বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি। তাই এ নিয়ে আলোচনা চলছে। জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির সাংবিধানিক আইনের অধ্যাপক জনাথন টার্লির মতে, এটা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করে না। তিনি হেরেছেন বলে তাকে সন্তুষ্ট করতে হবে এমন নিয়ম নেই। দায়িত্ব গ্রহণের দিন নতুন প্রেসিডেন্ট থাকবেন সিক্রেট সার্ভিসের অধীনে। উত্তরসূরীর শপথ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প অতিথি হিসেবে অংশ নেবেন। তিনি থাকলে অস্বাগত অতিথি হিসাবেই থাকবেন। আর দায়িত্ব ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে তিনি হবেন গ্রেফতারকৃত অতিথি। অধ্যাপক জনাথন টার্লি বলেন, যে কোনো প্রার্থীর প্রচারণা টিম ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। ৪৩টি অঙ্গরাজ্যে ফলাফল পুনর্গননার অনুমতি আছে। তবে এদের মধ্যে কিছু রাজ্যে আবার ভোটের ব্যবধানটা দেখা হয়। ফেডারেল নির্বাচন কমিশনারের তথ্যানুসারে, একটি রাজ্য ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ফলাফল জমা দিতে পারে। ১৪ ডিসেম্বর রাজ্যের ইলেকটররা একত্র হন এবং তাদের ভোট দেন। ৬ জানুয়ারি কংগ্রেস তাদের ভোটদানকে বৈধতা দেয়।
ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির সাংবিধানিক আইনের অধ্যাপক এডওয়ার্ড ফোলিও ১৮৭৬ সালের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ঐ বছর শপথ গ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগেও জয়-পরাজয়ের সিদ্ধান্ত আসেনি। কারণ রুথারফোর্ড বি হেইজ এবং স্যামুয়েল টিলডেনের কেউই সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পাননি। তিনটি রাজ্যের ভোটে সন্দেহ ছিল। ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদ এবং রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেটের কেউই সিদ্ধান্তে আসতে পারছিল না। এরপর কংগ্রেসে একটি কমিশন গঠন করে। এর সদস্য ছিলেন প্রতিনিধি পরিষদ, সিনেট ও বিচারপতিদের পাঁচ জন করে। তারা শেষ পর্যন্ত হেইজকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। আইন বিশেষজ্ঞ এবং ম্যাসাচুসেটসসের অ্যামহার্স্ট কলেজের অধ্যাপক লরেন্স ডগলাসের মতে, এক দেশে তিন প্রেসিডেন্ট হতে পারেন? সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কে জিতেছেন তা স্পষ্ট না হলে কংগ্রেসের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হবেন। প্রধান বিচারপতি হয়তো ন্যান্সি পেলোসিকে শপথ গ্রহণ করাবেন। আবার আরেক বিচারপতি ক্ল্যারেন্স টমাস শপথ গ্রহণ করাবেন ট্রাম্পকে। এমনও হতে পারে যে কেউই শপথ নিলেন না এবং ট্রাম্প, বাইডেন ও পেলোসি সবাই প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব এবং অধিকার দাবি করতে পারেন। ডগলাস লিখছেন, এর মধ্যে ট্রাম্প হয়তো এমন সব টুইট করবেন যা সহিংসতা উসকে দিতে পারে। মনে রাখতে হবে এদেশে প্রচুর বন্দুক আছে এবং এর অধিকাংশই ট্রাম্পের সবচেয়ে উগ্র সমর্থকদের হাতে।
মার্কিন আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প ভোটের ফলাফলে হেরে গেলেও হয়তো ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ এনে আইনি লড়াই চালানোর চেষ্টা করতে পারেন, তবে সেসব মামলায় তেমন কোনো কাজ হবে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প যাই করুন, আগামী ২০ জানুয়ারি নতুন প্রেসিডেন্ট শপথ নিলে মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং বিচার বিভাগসহ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নতুন প্রেসিডেন্টের হাতেই চলে আসবে। বাইডেন নতুন প্রেসিডেন্ট হলে তিনি চাইলে ট্রাম্পকে তখন হোয়াইট হাউজ থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারবেন।
উল্লেখ্য, বাইডেন নিজেই একবার বলেছিলেন যে, তিনি নিশ্চিত করছেন ট্রাম্প হেরে যাওয়ার পর হোয়াইট হাউজ ছাড়তে না চাইলে নিরাপত্তা বাহিনী তাকে সেখান থেকে বের করে নিয়ে যাবে। অবশ্য সিক্রেট সার্ভিস ঠিক কী করবে তা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে তারা এখনই জো বাইডেনকে নিরাপত্তা দিতে শুরু করেছে। তাহলে কি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন নির্বাচনের ফল না মানা এবং এর বিরুদ্ধে যে আইনি লড়াইয়ের কথা বলছেন সেগুলো সবই ফাঁকা বুলি?
কী ঘটতে পারে?
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলছেন, এক্ষেত্রে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে দুই দিকে সমস্যা হতে পারে। তিনি বলছেন, এমন হতে পারে—ভোট গণনায় যে ফল পাওয়া গেল তা অঙ্গরাজ্যের কর্তৃপক্ষ সার্টিফাই করলেন না। তবে এর সম্ভাবনা কম এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে রাজ্যগুলোর ফল নিয়ে আপত্তি করছেন সেগুলোও হয়তো অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষ সার্টিফাই করবেন। দ্বিতীয় সমস্যাটি হতে পারে ইলেকটোরাল কলেজ নিয়ে।
অধ্যাপক রীয়াজ বলছেন, ইলেকটোরাল কলেজের সদস্য নির্ধারণ করার দায়িত্ব হচ্ছে অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনসভার। আইনসভাগুলো চাইলে বাইডেনের সমর্থক প্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে নিজেদের পছন্দমতো ইলেকটোরাল কলেজের প্রতিনিধিদের ফেডারেল কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে পারেন। সেক্ষেত্রে ইলেকটোরাল ভোটের দুটো স্লেট হতে পারে—একটা হচ্ছে যা আসলেই পপুলার ভোটের রায় প্রতিফলিত করবে এবং আরেকটি রাজ্যের আইনসভাগুলোর আলাদা করে পাঠানো রায়।
তারা যে ভোট দেবেন তা আবার গোনা হবে ৬ জানুয়ারি কংগ্রেসে। কংগ্রেসের সেই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। তিনি যদি ইলেকটোরাল কলেজের ভোটগুলোর দুইটি স্লেটের একটা রেখে অন্যটা ফেলে দেন বা দুটোর কোনোটাই গ্রহণ না করেন তাহলে একটা সাংবিধানিক সংকট দেখা দিতে পারে। সংকটটা হলো—ভাইস প্রেসিডেন্ট দুটো স্লেটই প্রত্যাখ্যান করলে কোনো প্রার্থীরই ২৭০টি ইলেকটোরাল ভোট হবে না। সেক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট কে হবেন তা নির্ধারণ করবে কংগ্রেস। সেক্ষেত্রে প্রতিটি অঙ্গরাজ্য একটা করে ভোট পাবে; কিন্তু বর্তমানে ২৩টি অঙ্গরাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে ডেমোক্র্যাটদের এবং ২৬টিতে রিপাবলিকানদের। এভাবে ভোট হলে ২৬টি ভোট পেয়ে যাবেন ট্রাম্প এবং তিনিই প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হতে পারেন। এটা হবে এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি। তবে হাউজের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি হয়তো এ প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে বা থামিয়ে দিতে পারেন, তাহলে এক পর্যায়ে হয়তো তার হাতে দায়িত্ব এসে পড়তে পারে।
রিপাবলিকান পার্টি ও ভাইস প্রেসিডেন্টের ভূমিকাই আসল
এ?ই জটিল আইনি পরিস্থিতিতে রিপাবলিকান পার্টির ভূমিকার ওপর নির্ভর করছে যে, দেশ কোনো সাংবিধানিক সংকটের মধ্যে পড়ে কি না। ভোট জালিয়াতির যে প্রশ্ন তুলছেন ট্রাম্প তা কতটা বড় সংকট তৈরি করতে পারে? ড. আলী রীয়াজ বলছেন, বিশেষত পোস্টাল ভোটে যে জালিয়াতির কথা ট্রাম্প বলছেন, তা তাকে আদালতে প্রমাণ করতে হবে; কিন্তু তার পক্ষের লোকজনের করা এরকম অনেক মামলাই রাজ্য পর্যায়ের আদালতে গ্রহীত হচ্ছে না। তবে অধ্যাপক রীয়াজের মতে, ট্রাম্প আসলে যেতে চাইছেন সুপ্রিম কোর্টে। এক্ষেত্রে তার একমাত্র পথ হচ্ছে পেনসিলভেনিয়ার আদালতে পোস্টাল ভোটের জন্য তিন দিন পর্যন্ত সময় দেওয়ার ব্যাপারে একটি রায় দেওয়া হয়েছিল যে, রায়ের ফুটনোটে একটি মন্তব্য আছে—রাজ্য পর্যায়ের সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্ট বহাল রাখছে; কিন্তু আপাতত। নির্বাচনের পর এই মামলায় আবার ফিরে যাওয়া হতে পারে। এ কারণে সুপ্রিম কোর্ট মামলাটা আবার নিতে পারে; কিন্তু সেক্ষেত্রে এ রায়ের কারণে যাদের পাঠানো পোস্টাল ভোট নির্বাচনের পরের তিন দিন পর্যন্ত গৃহীত হয়েছে সেই ভোটারদের মৌলিক অধিকার সংকুচিত হবে। সেটা আরেক ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। এমনকি সংঘাতও তৈরি হতে পারে।
