ফরহাদ আলম
প্রতিটি ছুটি-ই অনেক আনন্দের; কিন্তু এবারের দীর্ঘকালীন ছুটি যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলে এসেছে একঘেয়েমি ভাব। আর ইচ্ছে হয় না ঘরের এক কোনায় থাকতে। তাই মন বারবার বলতেছে কবে ফিরব প্রাণের ক্যাম্পাসে।
সেই মার্চ মাসের ১৬ তারিখ! হঠাত্ ক্লাস থেকে ফেরার সময় নোটিশ পেলাম ৩১ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ থাকবে প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয়টি। অতঃপর ১৯ মার্চ পুরো ক্যাম্পাস যেন সুনশান। কোথাও নেই আড্ডা। খেলোয়ারশূন্য খেলার মাঠটি পড়ে আছে প্রাণহীন অবস্থায়। প্রেম পুকুরে নেই প্রেমিক-প্রেমিকার আড্ডা। দেখা যায় না শিক্ষার্থীদের ক্লাসে যাওয়া এবং হলে ফেরার দৃশ্য। পারভেজ মার্কেটে নেই কোনো কোলাহল। বন্ধ ডাইনিং এবং ক্যান্টিন।
শুধু ক্যাম্পাসের ভেতরেই নয়, পাকা মার্কেট, কলেজ গেইট, বউবাজার যেন জনশূন্য। পরিণত হয়েছে প্রাণহীন নগরীতে। কোথাও কেউ নেই। মনে হয় কোনো অদৃশ্য শক্তি আকস্মিকভাবে তাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিটি দোকানে ঝুলছে তালা, দেখা যায় না যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত বাস, সিএনজি, নেই কোনো রিকশা। এ যেন নিষ্প্রাণ নগরীতে পরিণত হয়েছে।
সারা দিন ঘোরাঘুরি এবং সন্ধ্যায় টিউশনি থেকে ফিরে সারা দিনের কর্মব্যস্ততা স্মরণ করে অনেক কিছুই চিন্তা করলাম। মনের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে চঞ্চলতা। যারা বলছিল হলে থাকবে তারাও একেক করে চলে যাচ্ছে। এদিকে আব্বু ফোন দেয় বাড়িতে আসার জন্য। অতঃপর সবকিছু চিন্তাভাবনা করে বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম এবং ট্রেনের টিকিট কাটলাম। সঙ্গে দুই-একটি বই এবং কিছু জামাকাপড় গুছিয়ে নিলাম।
ঢাকা থেকে দিনাজপুর প্রায় ১১ ঘণ্টার ভ্রমণ। এবারের ভ্রমণ অতীতের ভ্রমণের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন, কারণ খুব সতর্কতার সঙ্গে মুখে মাস্ক পরতে হয়, কোথাও কোনো জিনিস স্পর্শ করার পর হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হয়, বিষয়টি অত্যন্ত আশ্চর্যের। যেখানে সর্বদা কোলাহলপূর্ণ থাকত, সেখানে নেই কোনো জনসমাবেশ। ফাঁকা পড়ে আছে রেল স্টেশনটি। এ যেন নতুন অভিজ্ঞতা।
বাড়িতে বসে লকডাউনের সময়টি ভালোই কাটছিল; কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে লাগল। করোনা ভাইরাস যেন আতঙ্কের আরেক নাম। মৃত্যু এবং আক্রান্তের হার জ্যামিতিক হারে বাড়তে শুরু করল। এভাবে দেখতে দেখতে প্রায় সাতটি মাস অতিক্রম হয়ে গেল। যখন থাকার কথা ছিল প্রিয় ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় কিন্তু এখন শুধুই একা। ঘুম নষ্ট করে অ্যাসাইনমেন্ট লেখার, অথচ এখন ঘুমের জন্য প্রচুর সময়। কথা ছিল বিকালবেলা কেন্দ্রীয় মাঠে ফুটবল খেলার কিন্তু এখন শূন্য মাঠ পড়ে আছে, নেই কোনো খেলোয়াড়। কথা ছিল তাড়াহুড়া করে ঘুম থেকে উঠে ক্লাসে যাওয়ার অথচ এখন আর ঘুম থেকে ওঠার তাড়া নেই।
আশার আলো জ্বালিয়ে অপেক্ষার প্রহর কাটিয়ে অতিশিগিগরই নবাব সিরাজউদ্দৌলা হলের ১০ তলা ভবনের ছাদে ভোরের আলোয় দেখা মিলবে প্রিয় ক্যাম্পাসে। সেই চিরচেনা ক্যাম্পাস আবারও ফিরে পাবে সজীবতা। মুখরিত হবে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের পদচারণায়। এলার্মের শব্দে ঘুম ভাঙা ছাত্রটিকে ঘুম ঘুম চোখে নাস্তা না করে রাগান্বিত মুখে রাস্তার ধার বেয়ে হাঁটবে ক্লাসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।
