শিফারুল শেখ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইতিহাস গড়ে জয় পেয়েছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেন। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে একটা সংকট যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কিছু দিন ধরে থাকতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ সংকটের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ হিসেব করছে এই জয় থেকে তারা কী পাবেন। বিভিন্ন দেশের এসব আশা আর ধারণা নিয়ে বিশ্লেষণমূলক শনিবার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ মিডিয়া বিবিসি।
g চীনের কাছে বাইডেনের জয়ের অর্থ কী?
সাংবাদিক জন শুদ্ধোর্থ লিখেছেন, আপনি ধারণা করতে পারেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি আরেকবার ক্ষমতায় আসতেন তাহলে বেইজিং খুশি হতো। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছিলেন, নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন এবং করোনা ভাইরাসের জন্য চীনকেই দায়ী করেছিলেন। কিন্তু কিছু বিশ্লেষক বলছেন, চীন হয়তো বাইডেনের জয়ে আশাহত হবে। এর মানে এই নয় যে, ট্রাম্পের সঙ্গে চীনের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। বেইজিংয়ের সুবিধা ছিল, ট্রাম্প তার কাজের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে বিভক্তি তৈরি করেছিলেন। বিশ্ব নেতৃত্ব থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে এনেছিলেন। ফলে বিশ্বে চীনের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ বেড়েছিল। তাই তো চীনের মিডিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ভোটের চেয়ে এর প্রতিবাদ, বিক্ষোভ ও সহিংসতার দিকে বেশি নজর দিয়েছে। বাইডেন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকেই বেশি গুরুত্ব দেবেন। তাই তিনি কমিউনিস্ট পার্টিকে এক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগ করতে পারেন। আবার বাইডেন তার ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার ঘোষণা দিয়েছেন যা চীনের জন্য ক্ষতিকর।
g ভারত কী পাবে?
দিল্লি থেকে সাংবাদিক রজনী বৈদ্যনাথন লিখেছেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস ভারতীয় বংশোদ্ভূত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চেয়ে বাইডেনের কাছ থেকে নিরস অভ্যর্থনা পেতে পারেন। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাই ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাইডেনের শাসনামলে নীতিতে খুব বেশি পরিবর্তন হবে না। চীনের ক্ষমতা হ্রাসে ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সদ্যনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত রসায়ন খুব মিলবে না। প্রধানমন্ত্রী মোদির দেশীয় অনেক বিতর্কিত কাজে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সমালোচনা করেননি। কিন্তু বাইডেন সেটা নন। তিনি কাশ্মীরে সব নাগরিকের অধিকারের কথা বলেছেন। বাইডেনের ওয়েবসাইটে ভারতের নাগরিকত্ব নিবন্ধন আইন (এনআরসি) এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) সমালোচনা করা হয়েছে। এমনকি কমলা হ্যারিসও এসবের সমালোচনা করেছেন। তবে হোয়াইট হাউজে গিয়ে তিনি কী করেন সেটাই দেখার বিষয়।
g উত্তর কোরিয়া আবার ট্রাম্পকে চেয়েছিল?
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আরেকবার ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছিলেন। কারণ তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে দুই বার বৈঠক করে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছেন। আবার পরমাণু অস্ত্রও তৈরি করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছে। তবে বাইডেন হয়তো সেটা করবেন না। তিনি চাইবেন, তার সঙ্গে বৈঠক করার আগে কিম জং উন যেন পরমাণু অস্ত্র ত্যাগ করেন।
g যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য সম্পর্কে অবনতি হবে!
লন্ডন থেকে জেসিকা পার্কার লিখেছেন, কট্টর ব্রেক্সিটপন্থি বরিস জনসনের সঙ্গে জো বাইডেনের মতের মিল হবে না। তিনি তার সাবেক গুরু বারাক ওবামার পথেই হাঁটবেন। নর্দার্ন আয়ারলান্ডের প্রতি বাইডেনের জোর সমর্থন রয়েছে। তাই নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে ব্রিটেনের গুড ফ্রাইডে চুক্তিকে সম্মান জানিয়েই ওয়াশিংটন লন্ডনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করবে। তাই ‘লাভ বোমা’ লন্ডনের সঙ্গে আলোচনার আগে বাইডেন ব্রাসেলস, বার্লিন এবং প্যারিসের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তবে দুই নেতা একই গ্রাউন্ডও খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন।
g রাশিয়ার পরিস্থিতি কী হবে?
বাইডেন রাশিয়াকে আমেরিকার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করেন। ২০১১ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালেও বাইডেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সমালোচনা করেছিলেন। পুতিন সেটা ভোলেননি। ভৌগোলিক কূটনীতিতে বাইডেনের সঙ্গে পুতিনের মিল নেই। আর ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় আসা মানে রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের বিষয়টিও আবার সামনে নিয়ে আসতে পারেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন।
g স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে জার্মানি
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পররাষ্ট্র নীতির জন্য তাকে জার্মানির মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন বলে পিউ রিসার্চ সেন্টার জানিয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের চেয়েও ট্রাম্পকে বেশি জার্মান অপছন্দ করেন। ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধে জার্মানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের সঙ্গেও ট্রাম্পের সম্পর্ক ভালো নয়।
g বাইডেনে খুশি ইরান
বাইডেনের জয়ে ইরান পরমাণু চুক্তি নিয়ে সমঝোতার টেবিলে আসতে পারে। যদিও ট্রাম্প কয়েক সপ্তাহ আগে বলেছিলেন, তিনি দ্বিতীয় বার প্রেসিডেন্ট হলে সমঝোতার প্রস্তাব দিয়ে প্রথম ফোনটি ইরানের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকেই পাবেন। কিন্তু তেহরান জানে ট্রাম্পের সঙ্গে সমঝোতার মূল্য কতটা দিতে হবে। কারণ বাইডেনের গুরু ওবামা ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে ছয় জাতির পরমাণু চুক্তি করেছিলেন এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা বলেছিলেন।
g ইসরাইল নীতির পরিবর্তন ঘটবে
ইসরাইল নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে পরিবর্তন ঘটতে পারে। ইরানের সঙ্গে বাইডেন আগের পরমাণু চুক্তিতে ফিরে এলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। ফিলিস্তিনি নীতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
g চিন্তায় মিশর, খুশি কিউবা, উল্লসিত কানাডা
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হেরে যাওয়ায় চিন্তিত মিশরের সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট আব্দুল ফাত্তাহ আল সিসি। কারণ ট্রাম্পের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত রসায়ন ছিল খুবই ভালো। সিসির সমালোচকরা অনেকেই বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অন্ধভাবে সিসিকে সমর্থন করেন। কিন্তু বাইডেন মানবাধিকার কর্মীদের কথা শোনেন। সেক্ষেত্রে সিসিকে নতুন প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে। এছাড়া কিউবার অধিকাংশ মানুষ চান ট্রাম্প বাদে যুক্তরাষ্ট্রে যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাতেই তারা উচ্ছ্বসিত হবেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো যে কোনো মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করলেও ট্রাম্পের বিদায়ে কানাডার জনগণ কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন।
