প্রশিক্ষণ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২০, ২১:৫৩

প্রশাসনযন্ত্র একটি দেশের প্রধান চালিকাশক্তি। যেই দেশের প্রশাসন যত শক্তিশালী ও স্বচ্ছ হইয়া থাকে, সেই দেশ ততটাই গতিশীল। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রশাসনযন্ত্রকে গতিশীল করিতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হইলেও অনেকেই মনে করেন তাহা বহু ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত গতি লাভ করিতে পারে নাই। ইতিপূর্বে আমরা প্রশাসন ক্যাডারে দক্ষতা, মেধা ও সৃজনশীলতা লইয়া সরকারের নীতিনির্ধারক মহলকে উদ্বিগ্ন হইতে দেখিয়াছি। অভিজ্ঞজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, যে নথি তিন-চার দিনে অনুমোদন হওয়া সম্ভব; কর্মকর্তাদের দক্ষতা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার অভাবে তাহা বহু ক্ষেত্রে কয়েক মাস অবধি সময় নষ্ট করিয়া থাকে। ইহাতে নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নেও বিলম্ব ঘটে। ফাইল যথাসময়ে নিষ্পত্তি, সিদ্ধান্তগ্রহণ, সভা আহ্বান, নূতন প্রকল্প গ্রহণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম লইয়া সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রায়শই প্রশ্নের মুখোমুখি হইয়া থাকেন। নিঃসন্দেহে এই বিষয়গুলি খুব সহজ নহে। গতকাল রবিবার ইত্তেফাকে এই সংক্রান্ত একটি খবরে বলা হইয়াছে, প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান কাজে আসিতেছে না আমলাতন্ত্রে। যেই কর্মকর্তা যেই বিষয়ে শিক্ষালাভ করিয়াছেন বা চাকরিতে প্রবেশ করিয়া প্রশিক্ষণ লইয়াছেন কিংবা লইতেছেন—সেই সকল বিষয় মূল্যায়ন করিয়া প্রশাসনে পদায়ন করা হয় না। সংবাদে বলা হইয়াছে, বস্তুত, ‘মুখচেনা’ এক অদৃশ্য পদ্ধতিতে পদায়ন হইয়া থাকে।

ইহা ঠিক যে কমবেশি তদবির সকল সময়ই সকল জায়গায় ছিল। কিন্তু আমলাতন্ত্রে অভিজ্ঞ লোক পাওয়া খুব সহজ ব্যাপার নহে। তবে প্রশাসনকে গতিশীল করিতে সাধারণ আমলাদের প্রশিক্ষিত করিবার ব্যবস্থাও সরকার করিতেছে। সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) কর্মকর্তাদের আরো দক্ষ হিসাবে গড়িয়া তুলিবার জন্য হার্ভার্ড, ক্যামব্রিজ ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের বিভিন্ন বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া ও প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হইতেছে। সুতরাং অপ্রশিক্ষিত আমলাদের সংখ্যা একপর্যায়ে ক্রমান্বয়ে কমিয়া আসিবে নিশ্চয়ই। ইহা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। প্রকৃতপক্ষে, আমলাতন্ত্রের গতিবিধি বুঝিতে আমরা ব্র্রিটিশ আমলের দিকে একটিবার দৃষ্টি দিতে পারি। কারণ, বাংলাদেশের বর্তমান জনপ্রশাসন ব্রিটিশ শাসকের তৈরি জনপ্রশাসনেরই উত্তরাধিকার বহন করিতেছে। অন্যদিকে ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের উত্পত্তি ও বিকাশ ঘটিয়াছিল আড়াই শত বত্সর পূর্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরিয়া। তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হইল, ব্রিটিশ আমলে ভারতবর্ষে আমলাতন্ত্রের আকার ছিল ছোট, কিন্তু দক্ষতায় ছিল সেরা। উপমহাদেশ ত্যাগের পূর্বে মাত্র দেড় হাজার আইসিএস-আইপিএস কর্মকর্তা দিয়াই ব্রিটিশরা ভারতবর্ষের আফগান সীমান্ত হইতে মিয়ানমার (বার্মা) পর্যন্ত বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা করিতেন অত্যন্ত দক্ষতার সহিত। সুতরাং দক্ষ আমলা একটি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখিতে হইবে, সরকার তাহার নির্ধারিত লক্ষ্য কতটুকু অর্জন করিতে পারিবে তাহা বহুলাংশে নির্ভর করিয়া থাকে আমলাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা ও সক্ষমতার উপর। ভারতের ক্ষেত্রেও দেখা গিয়াছে, দেশটির আমলাদের দক্ষ করিতে বিশেষ ধরনের ‘কর্মযোগী’ প্রকল্প গ্রহণ করা হইয়া থাকে। ইহার মূল লক্ষ্য বিশ্বের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হইবার জন্য আমলাদের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হিসাবে গড়িয়া তোলা। একই সঙ্গে তাহাদের  পেশাদার ও প্রগতিশীল, কর্মচঞ্চল, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিতে সড়োগড়ো, গঠনমূলক ও সৃজনশীল করিতেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

সুতরাং প্রশিক্ষণ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ যেন সঠিকভাবে হয়, তাহা মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা থাকা উচিত। আর প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করিবার বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা আশা করিব, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণের পর কিছুদিন অন্তত ঐ বিভাগে কার্য সম্পাদনের ব্যবস্থা রাখিবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।