বৈদেশিক বিনিয়োগ¬ টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে অপরিহার্য

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২০, ২১:৫৬

মুমতা হেনা মীম

দেশকে টেকসই উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরের জন্য প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা জরুরি। এ জন্য দরকার যথেষ্ট পরিমাণে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সহায়ক পরিবেশ। অধিক পরিমাণে বিনিয়োগ দেশের অবকাঠামোগত ও ভৌত উন্নয়ন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও বৈষম্যের অবসানে সাহায্য করে। এজন্য বাংলাদেশ সরকার বেসরকারি বিনিয়োগে একটি সহায়ক ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ নীতির ক্ষেত্রে বেশ কিছু সংস্কার করা প্রয়োজন।

২০১৮ সালে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ৩ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার; কিন্তু ২০১৯ সালে বাংলাদেশে এফডিআই এসেছে মাত্র ১ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার।

যা বিগত বছরের তুলনায় অপ্রত্যাশিতভাবে ৫৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ কমে গেছে। ২০১৯ সালে বিনিয়োগের এ নাজুক অবস্থা সত্যিই অর্থনীতিতে গুরুতরভাবে প্রভাব ফেলেছে। আর এ বছর কোভিড-১৯ মহামারির কারণে ধ্বংসের মুখোমুখি সারা বিশ্ব অর্থনীতির ৪০ শতাংশেরও বেশি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কোভিড-১৯-এর কারণে বিশ্ব জুড়ে ব্যবসায়-বাণিজ্যের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি কাটিয়ে ব্যবসায়-বাণিজ্য পুনরায় শুরু করায় ধীরে ধীরে বিশ্ববাণিজ্যে গতি আসছে; কিন্তু উত্পাদনব্যয়সহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বেড়েছে অনেকাংশেই। তাই আগের মতো অপেক্ষাকৃত কম খরচে ব্যবসায় করতে এবং পুঁজির স্বাভাবিক ধর্ম অনুযায়ী মুনাফা বৃদ্ধিতে চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা খুঁজছে নতুন গন্তব্য।

সম্প্রতি প্রতিবেশী দেশ ভারত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৭০ শতাংশ বিনিয়োগ তাদের দখলে চলে যায়। এর কারণ ওয়ালমার্ট কর্তৃক ফ্লিপকার্টের অধিগ্রহণ। গতবছর দক্ষিণ এশিয়ার বিনিয়োগের ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ভারতে যায়। তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। তালিকার তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে রয়েছে যাথাক্রমে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান। গতবছর জাপান টোব্যাকো কর্তৃক এদেশের টোব্যাকো অধিগ্রহণের ফলে বিনিয়োগ ১৫০ কোটি ডলার বৃদ্ধি পায়। অনেকে আশা করছেন করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ বিদেশিদের কাছে নতুন গন্তব্য হিসেবে আকৃষ্ট হবে। এর কারণ প্রায় ১৭ কোটি মানুষের অধিক জনগোষ্ঠী অর্থাত্ বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার ও তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য শ্রম এদেশে পাওয়ার কারণে তারা সহজেই এবং নির্ভরযোগ্য হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নিচ্ছে। তাছাড়া ভৌগোলিক দিক দিয়েও এর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের জন্য বাংলাদেশ বাণিজ্যের জন্য বেশ ইতিবাচক, নানা প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এ দেশে যে কেউই বিনিয়োগ করে সহজেই মুনাফা অর্জন করে নিয়ে যেতে পারে। ফলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ যে কোনো বিনিয়োগকারীর জন্য আকর্ষণীয় ক্ষেত্র।

সম্প্রতি এক কনফারেন্সে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, করোনা মহামারি সংকটের মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির পাশাপাশি নতুন সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলোকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে বেশ কিছু পলিসি পরিবর্তন করা অত্যাবশ্যক। বিনিয়োগের লভ্যাংশ নিজ দেশে সহজে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির অন্যতম শর্ত।

বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা নীতিতে পরিবর্তনে গৃহীত উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন হলে বৈদেশিক মুদ্রা বা এফসি অ্যাকাউন্ট খুলে লাভের টাকা রাখতে, বিনিয়োগ করতে এবং ফেরত নিতে পারবেন বিদেশিরা। বর্তমানে দেশে মূল্য সংযোজন করের হার ১৫ শতাংশ। বিনিয়োগ টানতে সংশ্লিষ্ট মূল্য সংযোজন করের হার হ্রাস করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে।

বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের স্বার্থে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে এবং বিনিয়োগকারীদের এক ছাতার নিচে সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করতে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস বিল-২০১৮’ সংসদে পাশ হয়েছে। তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বিনিয়োগকারীদের দ্বারা প্রস্তাবিত কোনো প্রকল্প বা উদ্যোগের জন্য যে কোনো সুবিধা যেমন—প্রণোদনা, ট্রেড লাইসেন্স, জমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি, পরিবেশ ছাড়পত্র, নির্মাণ অনুমোদন, বিদ্যুত্, গ্যাস ও পানি-সংযোগ, টেলিফোন-ইন্টারনেট সংযোগ, বিস্ফোরক লাইসেন্স, অনুমতি, ছাড়পত্রসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিশ্চিত করতে পারলে এ দেশে বিদেশি বিনিয়োগ অনেকটা আকর্ষণীয় হবে। আর এর প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারলে দেশকে আরো একধাপ এগিয়ে নিতে সক্ষম হব আমরা। নির্ধারিত লক্ষ্যের সময়ের আগেই হয়তো আমরা উন্নত বিশ্বের কাতারে যেতে পারব।

n লেখক :শিক্ষার্থী, সাহিত্যিক ও গবেষক, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়