জিসান তাসফিক
প্রায়শই খবরের কাগজে কিংবা গণমাধ্যমে প্রতারণার কথা শুনতে পাওয়া যায়। প্রতারণা আজ সমাজের আতঙ্ক। সমাজে বসবাসের ফলে মানুষের সঙ্গে মানুষের বিভিন্ন সম্পর্কে তৈরি হয় যার ভিত্তি হলো বিশ্বাস করা। প্রতারণার ফলে মানুষ মানুষে বিশ্বাস হারিয়ে যায়। যার ফল পরোক্ষভাবে সমাজের ওপরে এসে পড়ে। সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ মানুষের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট করে বলে প্রতারণাকে সামাজিক ভাইরাস বলা উচিত।
উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, প্রতারণা হচ্ছে অসদুপায় অবলম্বন করে কোনো কিছু সমাধানের সক্ষমতার কারণে পুরস্কার গ্রহণ করা। আবার বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪১৫ ধারায় প্রতারণার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। আসলে প্রতারণার নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া খুব কঠিন। কারণ প্রতিনিয়ত প্রতারকরা নতুন নতুন উপায় মানুষকে প্রতারিত করছে। প্রতারণার ইতিহাস যদি দেখা যায় তবে সেটার হদিস পাওয়া যাবে না, কারণ এটি অত্যন্ত প্রাচীনকালের অপরাধগুলোর মধ্যে একটি। প্রতারকরা সুকৌশলে প্রতারণা করে থাকে।
প্রতারণা করা বরাবরই আইনত অপরাধ। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪২০ ধারা অনুযায়ী যার সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছরের কারাদণ্ড এবং সঙ্গে অর্থদণ্ডও দিতে পারে। আবার যারা এর সঙ্গে জড়িত থাকে কিংবা সহায়তা করে তারাও দণ্ডবিধির ৩৪, ৩৫, ১০৭ ও ১০৮ ধারা অনুযায়ী সমান অপরাধী ও সমান দণ্ড পাবে। বর্তমানে প্রতারণার ক্ষেত্র এতটা ব্যাপক যে, উক্ত আইনগুলো অপরাধের শাস্তি হিসেবে যথেষ্ট নয়। আবার আলাদা প্রতারণার ধরনভেদে আলাদা আইন ও মামলা-মোকদ্দমা হয়। যেমন চেক জালিয়াতি, দলিল জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাত্ ইত্যাদি। আবার ক্ষতিপূরণের দাবিতে দেওয়ানি মামলা করা যায়। এসব মামলাতে প্রতারণা প্রমাণ করাই কষ্টকর কাজ। আবার যেমন সমাজ কিছু সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র আছে যারা মেয়েদেরকে ব্যবহার করে ছেলেদের সঙ্গে বিবাহ সম্পাদন করায়। পরবর্তীকালে নারী নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে মোহরানা আদায় করে তালাক দিয়ে দেয়। কিছু সিন্ডিকেট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা খেলেও অনেকে ধরাছোঁয়ার বাহিরে রয়ে যায়। এখানে আইনের অপর্যাপ্ততা ও যথেষ্ট সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া যায় না। বের হয়ে এসে আবারও প্রতারক চক্রে যোগদান করে।
প্রতারণা থেকে বাঁচতে হলে সচেতনতার বিকল্প নেই। কোনো ব্যবসা কিংবা লেনদেনে গেলে আইনসম্মত উপায়ে চুক্তি করে নিতে হবে। কারণ প্রতারকদের প্রধান লক্ষ্য থাকে অর্থসম্পদ আত্মসাত্ করা। কোনো বিষয়ে লিখিত প্রমাণ ও সাক্ষী থাকলে খুব সহজে প্রমাণ করা যায়। রাস্তাঘাটে চলাকালীন অন্যকে কোনো প্রকার সুযোগ দেওয়া কিংবা বিশ্বাস করা যাবে না। বিভিন্ন জায়গায় অবস্থানকালে স্থানীয় পুলিশ স্টেশনের খোঁজ রাখতে হবে। প্রতারিত হলে যতদ্রুত সম্ভব থানায় সাধারণ ডায়রি করতে হবে। প্রতারকরা অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও সুকৌশলে কাজ করে। তার জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্বে যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ নিয়ে আইনি প্রতিকার নিতে হবে। প্রতারক চক্রকে নিয়ে আরো আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন এবং সব ধরনের প্রতারণাকে সুনির্দিষ্ট চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সরকারি উদ্যোগ ও জনগণকে সরকারের পাশে থাকতে হবে। সবশেষে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে, সব সময় নিজেকে নিরাপদ অবস্থানে রাখতে হবে কারণ অপরাধের প্রতিকারের থেকে প্রতিরোধ উত্তম।
n লেখক :শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
