ফিরে দেখা

‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২০, ১৯:০২

 

১০ নভেম্বর ১৯৮৭, সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি। দুরন্ত এক যুবকের বুকে লেখা ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’, পিঠে লেখা ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। গুলিস্তান এলাকায় বিশাল মিছিল। মিছিলের ঢেউ তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে, স্বৈরাচারেরা কোনোভাবেই তা মেনে নিতে পারেনি। স্টেনগানের গুলি ঝাঁজরা করে দেয় যুবকের বুক-পিঠ। যুবকের নাম নূর হোসেন। সেদিন নূর হোসেন লুটিয়ে পড়েনি, গণতন্ত্র লুটিয়ে পড়েছিল মাটিতে; আর সেই মাটির বিমূর্ত ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে সারা বাংলা। এরই ধারাবাহিকতায় স্বৈরাচারের কাল গত হয়। ঘটনার ঠিক ৩ বছর ২৬ দিনের মাথায় পতন হয় এরশাদ সরকারের।

নূর হোসেন পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার ঝাটিবুনিয়া গ্রামের মজিবুর রহমানের ছেলে। থাকতেন পুরনো ঢাকার বনগ্রামে। বাবা বেবিট্যাক্সিচালক। মা মরিয়ম বেগম গৃহিণী। নূর হোসেন নিজেও ছিলেন পরিবহন শ্রমিক। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন তিনি। অভাবের তাড়নায় পড়ালেখা বন্ধ করে মোটর মেকানিকের কাজে যোগ দেন।

পরিবার থেকে বারণ ছিল যাতে নূর হোসেন মিছিলে না যান। তবু মিছিলে গেলেন। ইকরাম নামে এক সাইনবোর্ড লেখকের কাছে গিয়ে নিজের শরীরকে পোস্টার করে তোলেন তিনি। ৯ তারিখ রাতে এই পোস্টার লেখা থেকে পরের দিন ১০ নভেম্বর সকাল পর্যন্ত সেই স্লোগান ধ্বনিত হতে থাকে নূর হোসেনের শরীরে। পায়ে কেডস। পরনে জিন্সপ্যান্ট। গায়ের শার্ট কোমরে বাঁধা। খালি গায়ে বুকে-পিঠে লেখা স্বৈরাচার নিপাত যাওয়া এবং গণতন্ত্র মুক্তির স্লোগান।

১০ নভেম্বরের আগের দু’দিন নূর হোসেন ঘরে ফেরেননি। সেদিন ভোরের আলো ভালোভাবে ফোটার আগেই মা-বাবা ছেলের খোঁজে বের হলেন। হাজির হন মতিঝিলের নির্মাণাধীন ডিআইটি (রাজউক) মসজিদের একটি কক্ষে। সেখানে নূর হোসেন খালি গায়ে শুয়েছিলেন। সঙ্গে তাঁর এক বন্ধু। মা-বাবাকে দেখেই তিনি তড়িঘড়ি করে চাদর দিয়ে গা ঢাকেন। মা কিন্তু বুকে-পিঠের লেখা দেখে ফেলেন। জীবন্ত পোস্টার হয়ে যাওয়া ছেলের দিকে তাকান মা। মায়ের ভালোবাসার হাত সন্তানের পিঠ ছুঁয়ে যায়, ছুঁয়ে যায় পিঠে লেখা শব্দ ‘গণতন্ত্র’কে। মা বলেন, চল বাসায় চল। নূর হোসেন অটল থাকেন। বাবা-মাকে বলেন, ‘আপনারা যান। আমি আসতেছি।’ বাবা-মাকে বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে, নিজে বের হয়ে যান রাজপথে।

গুলিবিদ্ধ নূর হোসেনকে নিয়ে আরেক যুবক রিকশায় যাচ্ছিলেন হাসপাতালের দিকে। রিকশাটিকে পুলিশ ঘিরে ফেলে। গুলিবিদ্ধ নূর হোসেনকে টেনে-হিঁচড়ে রিকশা থেকে নামিয়ে পুলিশের গাড়িতে তুলে নেয় তারা। এরপর খোঁজ পাওয়া যায়নি তাঁর। নূর হোসেনের বোন শাহানার ভাষ্যমতে, সন্ধ্যায় বিবিসির খবর শুনে তাঁরা নিশ্চিত হন যে নূর হোসেন বেঁচে নেই।

যে স্থানে পুলিশের গুলিতে নিহত হন, তাঁর নামানুসারে গুলিস্তানের জিরো পয়েন্টের নামকরণ করা হয় ‘নূর  হোসেন চত্বর’। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর একটি ম্যুরাল রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ চত্বরে শহিদ, জাতীয় বীর, জগিবখ্যাত বুদ্ধিজীবী, কবি-সাহিত্যিকদের ভাস্কর্যের সঙ্গে রয়েছে নূর হোসেনের ভাস্কর্যও।