ক্ষুদ্র ভাইরাস, অসহায় বিজ্ঞান

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২০, ২১:৫৪

তত্ত্বীয় বিজ্ঞান কোথায় চলিয়া গিয়াছে, তাহা এক আইনস্টাইনের আবিষ্কারই এই পৃথিবীর সবচাইতে বড় প্রমাণ। আপেক্ষিক তত্ত্বের মাধ্যমে আইনস্টাইন প্রমাণ করিয়াছেন, মহাবিশ্বের পরমস্থান, পরমকাল এবং পরমভর বলিতে কিছুই নাই। ইহা এমন এক আবিষ্কার, কথিত আছে—এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোনো একটি উন্নত সভ্যতা লক্ষ বত্সর জ্ঞান বিকাশের পরও এমন সূত্র আবিষ্কারে সক্ষম হইতে না-ও পারে। তত্ত্বীয় বিজ্ঞান ছাড়াও ব্যাবহারিক বিজ্ঞানে, বিশেষ করিয়া প্রযুক্তিবিজ্ঞানে মানবজাতি অনেক দূর আগাইয়া গিয়াছে। বেশি দূর নহে, কলম্বাসের সময়ের কেহ যদি টাইম মেশিনে চড়িয়া এই সময়ে চলিয়া আসিতেন, তবে তিনি মনে করিতেন এই পৃথিবী জাদুময়। এই পৃথিবীর প্রতিটি রন্ধ্রে বিস্ময়কর জাদুর অপূর্ব স্পর্শ রহিয়াছে, যাহা কয়েক শতক পূর্বে অচিন্তনীয় ছিল, আজ তাহা মামুলি ব্যাপার। চাঁদে যাইবার মতো রূপকথা অর্ধশতক পূর্বেই বাস্তবতার আরশিতে ধরা দিয়াছে। মানুষ মঙ্গলের দিকে হাত বাড়াইয়াছে; কিন্তু কোথায় রহিয়াছে চিকিত্সাবিজ্ঞান?

বলা হইতেছে, সামান্য করোনা ভাইরাসের নিকট ধরাশায়ী হইয়াছেন বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। একটি ক্ষুদ্র ভাইরাস সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকে এমনভাবে কুপোকাত করিয়াছে, যাহাতে প্রতীয়মান হয়—চিকিত্সাবিজ্ঞানে আমরা এখনো যোজন পথ পিছাইয়া রহিয়াছি। আণুবীক্ষণিক জীবাণুর নিকট মানুষের অসহায়ত্বের ইতিহাস অবশ্য অনেক পুরাতন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষ সীমিত কিছু সাফল্য পাইয়াছে বটে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের কথা ধরা যাউক। আমেরিকার ম্যাপের দিকে তাকাইলে দেখা যাইবে, ইহার মধ্যাঞ্চলটি রিপাবলিক দলের লাল রঙে রঞ্জিত; কিন্তু মুশকিল হইল, যেই সকল অঙ্গরাজ্য রিপাবলিকাদের নিজস্ব বলিয়া এতদিন পরিচিত ছিল, তাহার মধ্যে কয়েকটি রাজ্য রীতিমতো বিরক্ত ছিল করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একের পর এক ব্যর্থতা ও উদাসীনতায়। যুক্তরাষ্ট্রে কোটির উপরে মানুষ করোনায় সংক্রমিত হইয়াছেন, মারা গিয়াছেন ২ লক্ষ ৩৭ হাজার আমেরিকান। এই ব্যাপারে ওয়াশিংটনে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জো গার্সটেনসন বলিয়াছেন, যুক্তরাষ্ট্রে যেই এলাকার মানুষ কোভিডে অধিক আক্রান্ত হইয়াছেন বা মহামারির কারণে ক্ষতি অধিক হইয়াছে, সেইখানকার মানুষ অধিক ক্ষিপ্ত হইয়াছেন ট্রাম্পের উপর। রিপাবলিকানদের দখলে থাকা রাজ্যসমূহে ট্রাম্পের পক্ষে এইবারও বিপুল জনসমর্থন ছিল; কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রকোপ যত বাড়িয়াছে, ততই ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা হ্রাস পাইতে শুরু করিয়াছে। বলা যায়, করোনা ভাইরাস রিপাবলিকানদের এই অঙ্গরাজ্যকে বাইডেনের হাতে তুলিয়া দিয়াছে। আমরা করোনার টিকারও বিশ্বরাজনীতি প্রত্যক্ষ করিতেছি। প্রকৃত অর্থে, বিশ্বে আগামী কয়েক বত্সরের অর্থনীতিও ভ্যাকসিননির্ভর হইয়া পড়িবার প্রবল শঙ্কা দেখা দিয়াছে। ইহার সহিত জড়িত বিলিয়ন বিলয়ন ডলারের ব্যবসা। তুলনামূলক দুর্বল দেশসমূহ ভ্যাকসিন পাইতে বন্ধু দেশের উপর নির্ভর করিতেছে। ইহার পাশাপাশি বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হইল—কোভিডের কি কার্যকর টিকা আদৌ আবিষ্কার সম্ভব? এখনো বহু রোগের টিকা আবিষ্কার করিতে পারেন নাই বিজ্ঞানীরা। ৭৩ বত্সর হইতে চলিল, এখনো জিকা ভাইরাসের টিকা আবিষ্কার করা সম্ভব হয় নাই। সার্স, মার্স বা এইডসের মতো ঘাতক ব্যাধির টিকা এখনো অধরাই রহিয়া গিয়াছে।

মনে রাখিতে হইবে, কোভিডের কার্যকর টিকা প্রয়োগ শুরুর পর বিশ্বের কোথাও যদি একজনও কোভিড বাহক থাকেন, তবে এই বিশ্ব কোভিডের ঝুঁকি হইতে মুক্ত হইবে না। সুতরাং বিশ্বের পরাশক্তিদের নিজেদের স্বার্থেই কোভিডের ভ্যাকসিন সহজলভ্য করিতে হইবে। নচেত্ বিপদে পড়িতে পারেন আরো অনেক ট্রাম্প।