কাতারের জানালা :ইয়াসিনের কথা

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২০, ২১:৫৫

মো. জসীম উদ্দিন

কাতারে আবহাওয়া ধীরে ধীরে স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠছে। তাপমাত্রা কমে আসছে। রাস্তার পাশে নানা রঙের ফুল দিয়ে সাজিয়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। মানুষ এই সময়টার জন্যে অপেক্ষা করে থাকে। ছুটির দিনে বিশেষ করে সন্ধ্যার পর মানুষ ঘুরে বেড়ানোর জায়গায় ভিড় করে।

প্রতিদিনের মতো মোহাম্মদ ইয়াসিন তার কোম্পানির মোটরবাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। তিনি একটি ডেলিভারি কোম্পানিতে কাজ করেন। প্রতিদিন এই কাজ করে তিনি দক্ষ হয়ে উঠেছেন। এইরকম তার দিন চলে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বাংলাদেশের এই তরুণ তার কামানো টাকা দেশে পাঠান। কাতারে বসবাসরত ৪ লাখের বেশি বাংলাদেশির মতো ইয়াসিন আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকা বেগবান রাখছেন।

আজকেও ইয়াসিন অন্যদিনের মতো কাজে বেরিয়েছেন। একটু আরামের তাপমাত্রায় মোহাম্মদ ইয়াসিন তার বাইক নিয়ে রাস্তায়। আশপাশে দোকানে কিংবা মানুষের যাওয়া আসার দিকে চোখ গেলেও নজরটা রাখতে হয় সবসময় রাস্তার ওপর। এখানে ট্রাফিকের নিয়ম খুবই কঠিন। একটু এদিক ওদিক করার সুযোগ নেই। এর মধ্যে হঠাত্ ইয়াসিনের চোখে পড়ল হুইল চেয়ারে বসা এক ভদ্রলোককে। তিনি রাস্তা পার হওয়ার অপেক্ষায়। কিন্তু তাকে সাহায্য করার কেউ নেই। মুহূর্তে ইয়াসিন তার কর্তব্য স্থির করে ফেলেন। নিজের বাইক থামিয়ে, পার্ক করে এগিয়ে গেলেন হুইল চেয়ারে বসা ভদ্রলোককে রাস্তা পারে সাহায্য করতে। ভদ্রলোককে সাহায্য করে ফিরে গেলেন নিজের কাজে। এর মধ্যে এক পথচারী এই দৃশ্যটি তার মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করলে বিষয়টি ভাইরাল হয়ে যায়। ইয়াসিন সবার নজরে আসেন। নজরে আসেন স্থানীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের। তারা মোহাম্মদ ইয়াসিনকে ডেকে পুরস্কৃত করেন। তার কোম্পানি তাকে পদোন্নতি দেন। একজন বাংলাদেশি হিসেবে গর্বে বুকটা ফুলে উঠে আমাদের। আজকের পৃথিবীতে ভালো কাজের প্রশংসার পাশাপাশি এ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য শুনতে পাওয়া যায়। সেটা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। যারা বিরূপ মন্তব্য করেন, তাদের হূদয়ে ভালো কাজের প্রশংসা করার শক্তি নেই।

ইয়াসিনের সঙ্গে আমার দেখা হয়। আমরা অনেক বিষয় নিয়ে বিশেষত কাতারে তার প্রবাস জীবন নিয়ে কথা বলি। তার জীবন সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। তার এই উদার এবং পরোপকারী হূদয়ের কথা জানতে চাই। তার চেহারায় একধরনের সারল্য আছে। কথায় কথায় উঠে আসে, ছোটবেলায় বাবা মায়ের উপদেশে অন্যের উপকার করার শিক্ষা পেয়েছেন তিনি। সেই শিক্ষাকে মূল্যবান মনে করে তাকে জীবনে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন। সেটা দেশে হউক, আর বিদেশে হউক সর্বত্রই কাজে লাগানো যায়। পুরস্কারের আশায় নয়, নিছক মানুষ হিসেবে দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে কাজটা করেন তিনি।

মোহাম্মদ ইয়াসিনের এই কাজ আমাদের গর্বিত করে, অনুপ্রাণিত করে। আমার বিশ্বাস, অনেকে তার এই দৃষ্টান্তে উদ্বুদ্ধ হবেন। ঘটনাক্রমে যেদিন ইয়াসিনের সাহায্য করার খবর পত্রিকায় ছাপে সেইদিন কাতারের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে আমার পূর্ব নির্ধারিত বৈঠক ছিল। সেই বৈঠকে আমি পেপার কাটিংটি তাকে দেই। তিনি খুব আগ্রহ নিয়ে খবরটি দেখলেন। তার চোখে-মুখে একটা প্রশান্তি ফুটে উঠতে দেখলাম।

মোহাম্মদ ইয়াসিনের এই কাজ দেখে আমার একটি পরিকল্পনা মাথায় এলো, যার উদ্দেশ্য এই ধরনের ভালো কাজকে উত্সাহিত করা। একে আমি বলছি 3Rs : Recognize, Reward and Replicate। অর্থাত্ এই ধরনের ভালো কাজকে স্বীকৃতি দিয়ে, তাকে পুরস্কৃত করে, তার শীলন বা অনুশীলন করা, তাকে অনুসরণ করা। কাতারে বসবাসরত প্রতিটি প্রবাসী বাংলাদেশি এই স্লোগানে উজ্জীবিত হয়ে এগিয়ে আসতে পারেন। আমাদের দূতাবাসে আমরা এদেরকে ভালো মানুষ, অনুসরণযোগ্য মানুষ নামে পুরস্কৃত করতে চাই। তাহলে বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি দিনে দিনে আরো উজ্জ্বল হবে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মাঝে মধ্যে এর বিপরীত চিত্রও দেখা যায়। গুটিকতক মানুষের জন্য আমাদের দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এইসব ঘটনায় আমাদের দেশ সম্পর্কে স্থানীয় জনগণ এবং প্রশাসন নেতিবাচক ধারণা পান। এইসব কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। সবাই জানেন স্থানীয় আইন অমান্য করলে তার জন্যে এই দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অল্প কিছু মানুষের জন্য আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে দেওয়া সমীচীন নয়।

তবে এই কথাও পরিষ্কার করে বলতে চাই যে, এই দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা যাতে যথাযথ আইনি সহায়তা পেতে পারেন, কারুর যাতে অন্যায়ভাবে আইনের সহায়তা না পেয়ে কারাবরণ করতে না হয় কিংবা দেশে ফিরে যেতে না হয়, সেইজন্য দূতাবাস এখানে কিছু আইনবিষয়ক ফার্ম তথা আইনজীবীদের একটা তালিকা তৈরি করছে। আইনি সহায়তা দরকার এই ধরনের বাংলাদেশি নাগরিকগণ এইসব আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করতে পারবেন। কিন্তু যারা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত থাকবেন, তাদের দ্বারা বিদেশে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে দেওয়া উচিত হবে না। কেননা, এদের অপকর্মের কারণে লাখ লাখ বাংলাদেশির জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে যেতে পারে।

একজন মোহাম্মদ ইয়াসিন যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারলেন, তার থেকে শিক্ষাটা অনেক বড় এবং জরুরি। একটা কাজে এত সাড়া পড়ে গেল। লাখ লাখ ভালো কাজ করতে পারলে কাতারে আমাদের সুনামের যে জায়গা সৃষ্টি হবে তার সুফল হবে বহুগুণ। আসুন, আমরা সবাই ভালো কাজকে হ্যাঁ বলি, খারাপ কাজকে জোর গলায় না বলি। আসুন চিত্তের বিত্তকে কাজে লাগাই। নাগরিক হিসেবে এটি আমাদের সবার দায়িত্ব।

n লেখক : কাতারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত