জো বাইডেনের উত্থান

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২০, ২১:৫৬

মো. রাশেদ আহমেদ

প্রথমে উষ্ণ অভিনন্দন হোয়াইট হাউজের নবনির্বাচিত বাসিন্দা প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহুল প্রতীক্ষিত ও ঘটনাবহুল গত ৩ নভেম্বর নির্বাচনে মার্কিন ইতিহাসে ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিজ্ঞ ও রাজনীতিতে সমৃদ্ধ জো বাইডেনকে নির্বাচিত করেন শক্তিশালী দেশটির জনগণ। মোট ৫৩৮টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের মধ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন পেয়েছেন সর্বশেষ তথ্যমতে ২৯৩টি। অন্যদিকে, রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প পেয়েছেন সর্বশেষ তথ্যমতে, ২১৪টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট। কার্যত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার জন্য কমপক্ষে ২৭০টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট নিশ্চিত করতে হবে। এমনকি সবচেয়ে বেশি ঘনবসতিপূর্ণ অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ায় জয়লাভ করেছে ডেমোক্র্যাট শিবির। উল্লেখ্য, মার্কিন ইতিহাসে ১৯৬৪ সালে প্রথম ইলেকটোরাল কলেজ ভোট প্রবর্তন হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যে জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে ইলেকটোরাল কলেজ ভোট নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসসহ বহুবিধ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির কারণে এবারের মার্কিন নির্বাচন ছিল যে কোনো বারের তুলনায় দেশটির জনগণের কাছে অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রকে নিজ কক্ষপথে ফেরার নির্বাচন। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, কেন ডোনাল্ড ট্রাম্প পরাজয় বরণ করলেন? অন্যদিকে হোয়াইট হাউজে প্রবেশের চাবিকাঠি নিশ্চিত করার পেছনে প্রবীণ রাজনীতিবিদ জো বাইডেনের মূলমন্ত্র কী? এসবের উত্তর খুঁজে বের করার জন্য একটু পেছনের দিকে লক্ষ করা যাক। প্রথমত, বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস, অর্থাত্ কোভিড-১৯ প্রতিরোধে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম প্রশাসন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণহানির সংখ্যা ২ লাখ ১৫ হাজারের অধিক। এমনকি নির্বাচনি প্রচারণার সময় তিনি নিজেও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন। এত ব্যাপকসংখ্যক মার্কিনির প্রাণহানি খুব সহজভাবে মেনে নেয়নি দেশটির জনগণ, যা নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করছেন মার্কিন বিশ্লেষকেরা। তিনি বরাবরই করোনা ভাইরাস নিয়ে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচার করা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। একে চীনা ভাইরাস হিসেবে উল্লেখ করে চীনকে একঘেয়ে করে রেখে দেশটির জনগণের সমর্থন আদায়ের কৌশলে ব্যর্থ হন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দ্বিতীয়ত, ঘরোয়া অর্থাত্ নিজ দেশে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্ষমতায় থাকাকালীন বিভিন্ন ধরনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন ট্রাম্প। এমনকি মার্কিন ইতিহাসে তৃতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিশংসনের মুখোমুখি হন। এই নির্বাচনের ফলে মার্কিনিরা প্রমাণ করলেন যে ইমপিচমেন্টের সম্মুখীন হওয়া কোনো প্রেসিডেন্টকে তারা নিজ দেশ তথা বিশ্বের ক্ষমতাশীল নেতা হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি নন। তৃতীয়ত, ঐক্যবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে রিপাবলিকান শিবিরে অনভিজ্ঞ রাজনীতি ও ধনকুবের ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান ছিল চমকপ্রদ ঘটনা। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট দলের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন একজন অভিজ্ঞ ও ঝানু রাজনীতিবিদ। তিনি নির্বাচনি প্রচারণায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোভিড-১৯ মোকাবিলায় ব্যর্থতা, বেকারত্বের লাঘব টানা, বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব দুর্বল ও বর্ণবাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর ব্যর্থতার দিকগুলো জনগণের কাছে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। ১৯৪২ সালে পেনসিলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করা জো বাইডেন তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পথচলায় নানান ধরনের চড়াই-উতড়াই পেরিয়ে আজ তিনি বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। ১৯৭৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৫ বছর সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামার শাসনকালে তিনি ৪৭তম ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছেন এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ।

এবারের মার্কিন নির্বাচনে বেশ কিছু রেকর্ড হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আগাম ভোটের সংখ্যা প্রায় ১০ কোটি। মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ৭ কোটি ৩০ লাখের অধিক পপুলার ভোট পেয়েছেন জো বাইডেন। সেন্টার ফর রেসপনসিভ পলিটিক্সের তথ্যমতে, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের নির্বাচনি ব্যয় হয়েছে ৬৬০ কোটি ডলার, যা বৈশ্বিক মহামারি করোনার সংকটকালে খুবই ব্যয়বহুল।ইতিমধ্যে জো বাইডেন আনুষ্ঠানিক জয় নিশ্চিত হওয়ার পর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। বর্ণনা করেন এ জয় মার্কিন জনগণনের জয়, গণতন্ত্রকে সুসংহত করার জয়। রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঐক্যবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকার করেন। আগামী ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি নিয়মানুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রবীণ প্রেসিডেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করার মাধ্যমে মার্কিন সিংহাসনের চালিকাশক্তিতে অধিষ্ঠিত হবেন জো বাইডেন। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চার বছরের রিপাবলিকান দলের শাসনকার্যের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, আগামী দিনে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক শত শত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। আস্থার প্রতিদান দিতে হবে ধর্ম-বর্ণ-গোত্রনির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের মানুষকে। অন্যদিকে, রিপাবলিকান দলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান ও পতনের গল্প ব্যর্থতা-সাফল্য মিলেই উল্লেখ থাকবে মার্কিন ইতিহাসের পাতায়।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া