: ঐ দেখ, মিছিল হচ্ছে। আমি মিছিলে যাব।
মূলি বাঁশের ঘর পানদোকানদার সন্তকী চৌহানের। রাস্তার ঠিক পাশেই। তার সাত-আট বছরের ছেলে নরেশ চৌহান। ঘরময় ছুটোছুটি করছে। আর রাস্তায় চলমান মিছিলের স্লোগানে গলা মিলিয়ে সেও স্লোগান তুলছে। মা তাকে সামাল দিতে পারছেন না।
হঠাত্ হঠাত্ ইপিআরের টহল শহরময় আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টায়। বুকে কাঁপন লাগে মায়ের। কখন যে কী ঘটে কে বলতে পারে। এই তো কাল এক রিকশাওয়ালা শহীদ হলেন। মোহাম্মদ আলী। ওদিকে ঢাকা থেকে খারাপ খবর এসেছে। মিলিটারি নেমেছে ঢাকা শহরে। নির্বিচারে ট্যাঙ্ক-কামান চালিয়ে মানুষের পর মানুষ মেরে চলেছে। ইপিআর ক্যাম্পেও উত্তেজনা।
খবর পেয়েই উত্তপ্ত ঠাকুরগাঁও। ছোট মফস্বল শহর। ঘর ছেড়ে মানুষের পর মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছে। কারফিউ জারি করা হয়েছে। কিন্তু কে মানে কারফিউ? জনতার ঢল পুরো শহরকে ছেয়ে ফেলেছে। গতকাল ছিল ২৭ মার্চ। হাজার হাজার মানুষ এসে ভিড় জমিয়েছে স্থানীয় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের বাসার সামনে। জনতার ভিড় উপচে ছড়িয়ে পড়ে চৌরাস্তায় ও পাবলিক লাইব্রেরির মাঠে। মিছিলে মিছিলে স্লোগান। নেতারা বক্তৃতা দিয়ে জনতাকে আরো উদ্দীপ্ত করে তোলেন। সিদ্ধান্ত হয় ইপিআর ক্যাম্প আক্রমণ ও দখলের। বন্যার তোড়ের মতো জনতা এগিয়ে যেতে থাকে। হাতে তাদের লাঠিসোটা বৈঠা দেশি অস্ত্র। ইপিআরের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের বিরুদ্ধে এগুলোই তাদের সম্বল। কিন্তু বুকে এতটুকু ভয় নাই।
হঠাত্ মিছিলটি মাঝপথে থমকে দাঁড়ায়। দক্ষিণ দিক থেকে ছুটে আসছে একটা জিপ ও এক লরি বোঝাই সৈন্য।
মিছিলের সামনে এসে জিপ ও লরিটি থামল। জিপ থেকে নেমে এল এক মেজর। মোহাম্মদ হোসেন। তার পাশে ক্যাপ্টেন নাবিদ আলম। তাদের দেখেই ক্ষীপ্ত হয়ে উঠল জনতা। মিছিল থেকে ছুটে এল একজন। মোহাম্মদ আলী। রিকশাওয়ালা। সাহসী। বলিষ্ঠদেহী। মধ্যবয়সী। মুখে চাপ গাড়ি। মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন মেজর মোহাম্মদ হোসেনের সামনে। দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চস্বরে ধ্বনি তুললেন : জয় বাংলা! স্বাধীন বাংলা!
সাথে সাথেই লরি থেকে পর পর তিনটা গুলির শব্দ এল। সরাসরি এসে বিদ্ধ করল মোহাম্মদ আলীর বুক।
বিকট শব্দ বেরিয়ে এল মোহাম্মদ আলীর কণ্ঠ থেকে। যেন তার রক্তভেজা বুক চিরে বেরিয়ে এল শেষ স্লোগান। জনতা কিছুক্ষণের জন্য বিমূঢ় হয়ে পড়ল। ইতিউতি বিক্ষিপ্তভাবে ছুটোছুটি করতে লাগল। মুহূর্ত মাত্র। পরপরই তারা আবার সবাই সম্মিলিত হলো।
বিপদ গুনল মেজর ও ক্যাপ্টেন। তারা চট করে জিপে উঠে বসল। পর মুহূর্তে জিপ ও লরি উলটো দিকে ঘুরে রুদ্ধশ্বাসে পালিয়ে গেল।
সারা শহরে বারুদ জ্বলে উঠল।
ঐদিনই মোহাম্মদ আলীর দাফন হলো রাস্তার পূর্বপাশে। রাস্তার নামকরণ হলো শহীদ মোহাম্মদ আলী সড়ক। আর এদিকে উত্তাল জনতা মিছিলে মিছিলে ছেয়ে ফেলল সারা শহর।
পরের দিনও রাজপথে জনতা নেমে আসে কারফিউ লংঘন করে। তার ঢেউ এসে লাগে বালক নরেশ চৌহানের বুকেও।
মায়ের কোলে থেকেও সে ছটফট করতে থাকে। থেকে থেকে স্লোগান দিয়ে ওঠে : জয় বাংলা! বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর।
এক লরি যাচ্ছিল রাস্তা কাঁপিয়ে। পাশেই কুঁড়েঘর। ঘর থেকে এক বালক স্লোগান দিয়ে উঠছে: জয় বাংলা! ট্রাকের সিপাইদের কানে খট করে লাগল শব্দটা। তাদের সহ্য হলো না। কুঁড়েঘর লক্ষ করে ছুটে গেল গুলি। কাতরে উঠল নরেশ চৌহান। আকুল কান্নায় ছেলেকে বুকে জড়িয়ে মা দেখতে পেলেন তার কোল ভেসে যাচ্ছে রক্তে। মৃত্যুব্যথায় কাতর ছেলে আকুল হয়ে তাকাল মায়ের দিকে। তার ঠোঁট মৃদু কাঁপছে। যেন আবার বেরিয়ে আসতে চাইছে : জয় বাংলা।
