প্রণব মজুমদার
অনেক দিন থেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল! সাধারণ মানুষের জীবন স্তব্ধ হয়ে আসছে। করোনার প্রভাবে দেশেও লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকে সঞ্চয়ের শেষ অংশটুকু হারিয়ে পথে বসেছে। এসব মানুষ এখন দিশেহারা। এ সময় মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে বাজারদর।
কিছুতেই অসাধু ও মুনাফাখোরদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকার ব্যর্থ। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অপর্যাপ্ত সরবরাহ এবং নানা অজুহাত দেখিয়ে বাজার অস্থিতিশীল করে যাচ্ছে এই সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী। বাজারে এই প্রবণতা আজকের নয়। মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য সরকারের নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর। বাজারে দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং ক্রেতার অধিকার বাস্তবায়ন করতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং প্রশাসনের দায়িত্বশীলতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। নব্বইয়ের দশক থেকে আমরা দেখে আসছি, রমজানের আগে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করে। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয় না। আমাদানি বাড়িয়েও ইতিবাচক ফল আসে না। এর মধ্যে সংঘবদ্ধ ব্যবসায়ীরা লুটে নেন মুনাফা। ভোক্তা ঠকানো, জালিয়াতি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিমুনাফা এবং বাজার অস্থিতিশীল করা অভিযুক্ত ব্যবসায়ী ও বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানা ছাড়া কোনো দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা সরকারকে নিতে দেখিনি আমরা। এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে কোনো বড় ধরনের ফৌজদারি মামলা হয়নি।
বিগত কয়েক বছরে আমাদের দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য হিসেবে চাল, ভোজ্যতেল ছাড়াও যে পণ্যটি মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ব্যবসায়ীরা খেলছেন তা হলো পেঁয়াজ! এবার যুক্ত হলো দেশের সব শ্রেণির ভোক্তার প্রধান খাদ্য ভাতের সঙ্গে অপেক্ষাকৃত সস্তা পণ্য হিসেবে আলু। হয়তো সামনে আরো পণ্য যুক্ত হবে! মূল্য নিয়ন্ত্রণে মূল জায়গায় না গিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে আলুর দাম ৩০ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। এটা যে ফলদায়ক সমাধান নয়, তা বাজারে যারা কেনাকাটা করেন তারাই জানেন। আলুর উপকরণে নির্ভর খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ। ফুটপাতে ৫ টাকা দামের একটি শিঙাড়া এখন ১০ টাকা। টিসিবি খোলাবাজারে প্রতি কেজি আলু বিক্রি করছে ২৫ টাকায়। কিন্তু তাদের এই বিক্রয় কার্যক্রম পর্যাপ্ত নয়। ফলে বাজারে কেজিপ্রতি আলু কিনতে হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। মৌসুমে যে কোনো পণ্যের দাম যা কাঙ্ক্ষিত হওয়ার কথা, তা হচ্ছে না। যেমন ধরুন আলু। শীত মৌসমে বর্তমান বিপণনব্যবস্থায় রাজধানীতে মুন্সীগঞ্জের এক কেজি আলুর খুচরা দাম পড়ে ৬ থেকে ৮ টাকা। কিন্তু বাস্তবতা উলটো।
নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির পেছনে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মহামারি থাকতেই পারে। এই অজুহাত সব সময় প্রযোজ্য নয়। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঘোড়ার জন্য সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ও দীর্ঘশ্বাস আর কতকাল? মুক্তবাজার প্রক্রিয়ায় বেসরকারীকরণ সব সময় ইতিবাচক ফল দেয় না, সে উদাহরণ হলো আমাদের পণ্যবাজার। সব শ্রেণির মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য খাদ্যে রেশনিং প্রথা পুনরায় চালু করা এখন সময়ের দাবি। জাতীয় পরিচয়পত্রকে ভিত্তি করে সামান্য ভর্তুকি দিয়ে দেশে বিধিবদ্ধ রেশনিং ব্যবস্থা আবার চালু করা উচিত। খাদ্যপণ্য নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর বিধিবদ্ধ রেশনিং ব্যবস্থা ১৯৪৩ সাল থেকে এ দেশে চালু ছিল। মুক্তবাজার অর্থনীতির দোহাই দিয়ে খালেদা জিয়ার সরকার ১৯৯২ সালের ২৮ এপ্রিল খাদ্যে রেশনিং ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। এরশাদ সরকারকে অনুসরণ করে তিনি ১৯৯১ সালের ১৭ ডিসেম্বর পল্লী রেশনিং ব্যবস্থা পুরোপরি বাতিল করেন। সাধারণ মানুষের জীবন যাপনকে অসহনীয় করে তোলার লক্ষ্যে জনগণের সরকার বলে দাবিদার খালেদার সরকার এ দেশে মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল।
বাজারদর নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকুক, সেটা আমরা সবাই চাই। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রকৃত অর্থে কার্যকর করাসহ অমৌসুমের জন্য মৌসুমে পণ্য ব্যাপকভাবে সংরক্ষণ করে দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা আমাদের সবারই প্রত্যাশা। পাশাপাশি দেশে খাদ্যে রেশনিং ব্যবস্থা পুনরায় চালু করার বিনীত অনুরোধ জানাই সরকারকে।
লেখক :গল্পকার, কবি ও সাংবাদিক
