প্রয়োজন সম্মিলিত অঙ্গীকার

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২০, ২১:৪১

জান্নাতুন নিসা

উল্কি আঁকা পেরেকের রাঢ়ভূমে আধিপত্য বিস্তারে জরিমাখা অবক্ষয়ের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নিজেকে অঙ্গার করেছে বিশ্বজয়ী মানুষ। ভালোবাসার দেনাকে নির্লজ্জ শৃঙ্গারে পাওনার শোধনাগারে পাঠাতে মনের নগ্ন জানালা মেলে ধরেছে। আর আধিপত্যের নিকৃষ্টতম সীমায় পৌঁছে মত্ত হয়েছে ধর্ষণের মতো কার্যকলাপে। ধর্ষণ বলতে আমরা যে কোনো ধরনের যৌন সহিংসতা কিংবা যৌন আক্রমণকে বুঝি। খুব সাধারণভাবে অধিকাংশ বিচারব্যবস্থায় ধর্ষণ বলতে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক অন্য কোনো ব্যক্তির সম্মতি ব্যতিরেকে তার সঙ্গে যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হওয়া কিংবা অন্য কোনোভাবে তার দেহে যৌন অনুপ্রবেশ ঘটানোকে বোঝায়। শারীরিক বল প্রয়োগ, অন্যভাবে চাপ প্রদান কিংবা কর্তৃত্বের অপব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত হয়ে থাকে ধর্ষণ। আবার অনুমতি প্রদানে অক্ষম (যেমন অজ্ঞান, বিকলাঙ্গ, মানসিক প্রতিবন্ধী কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্ক) কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যৌনমিলনে লিপ্ত হওয়াও ধর্ষণের আওতাভুক্ত। বিশ্ব জুড়ে প্রধানত পুরুষের দ্বারাই ধর্ষণ সংঘটিত হলেও আধুনিক দেশগুলোতে বিপরীত চিত্র নেহাত কম নয়, আর ধর্ষণের শিকার এক ব্যক্তির লিঙ্গ, বয়স, জাতি, সংস্কৃতি বা ধর্মের কোনো সীমারেখা পর্যন্ত নেই। ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক যুগ ও ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতে ধর্ষণের সংজ্ঞার ক্ষেত্রে ভিন্নতা দেখা দিয়েছে সব সময়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধর্ষণের সংজ্ঞারও পরিবর্তন ঘটেছে।

বিশ্বময় গণহত্যার একটি উপাদান হিসেবে স্বীকৃত ধর্ষণ। তবে সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, স্বাস্থ্যকর্মী ও আইনবিদদের মধ্যে ধর্ষণের সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ধর্ষণের সংজ্ঞা যাই হোক না কেন, বিশ্বের প্রায় ৩৫ শতাংশ নারী প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানির শিকার হন। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হলেও চুপ থাকেন, মাত্র ১০ শতাংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেন। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ ডটকম বলছে, অনেক নারী যৌন সহিংসতার ঘটনা নিয়ে অভিযোগই করেন না। কারণ দিন শেষে বিশ্বব্যাধি ধর্ষণের অ্যান্টিডট বা প্রতিষেধকহীন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে নারীকে ‘ভোগের বস্তু’ বা ‘মাংসপিণ্ড’ হিসেবে ভাবার উপকরণ ছড়িয়ে থাকার সুবাদে একজন নারীকেই হতে হয় ভোগান্তির শিকার। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী চালানো এক গবেষণা বলছে, ১৬ থেকে ১৯ বছর বয়সের নারীদের ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। ২০১৯ সালের এক সমীক্ষায় জানা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতি ১ লাখের মধ্যে ১৩২ জনেরও বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হন। আর দক্ষিণ আফ্রিকার মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিলের জরিপ অনুসারে, প্রতি চার জনের মধ্যে এক জন ধর্ষণ করে গর্বের সঙ্গে সে কথা স্বীকারও করে নেয় পরিবার, সমাজ কিংবা ধর্মের নামে। এযাবত্কালে দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ বোতসোয়ানায় দ্বিতীয়, লেসোথোয় তৃতীয় সর্বোচ্চ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। সুইডেনে প্রতি ১ লাখের মধ্যে ৬৩ জনেরও বেশি নারী ধর্ষিত হন। দক্ষিণ অ্যামেরিকার দেশ সরিনামে প্রতি ১ লাখ নারীর মধ্যে ৪৫ জন ধর্ষণের শিকার হন। মধ্য অ্যামেরিকার দেশ কোস্টারিকায় প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে ৩৭ জন ধর্ষণের শিকার হন। ক্যারিবীয় দেশ গ্রেনাডায় প্রতি ১ লাখ নারীর মধ্যে ৩১ জন ধর্ষণের শিকার হন। অন্যান্য প্রায় ১১৮টি দেশের মধ্যে চালানো এই জরিপে পিছিয়ে নেই যুক্তরাষ্ট্রও। দেশটির অবস্থান ১৪তম। ৪১তম অবস্থানে বাংলাদেশ। ৪২তম অবস্থানে থাকা জার্মানিতে প্রতি ১ লাখ নারীর মধ্যে ৯ জনেরও বেশি ধর্ষিত হন। আর ভারতে এই মাত্রা বেড়েই চলেছে লাগামহীনভাবে।

ধর্ষণের সূচনালগ্ন কবে, কোথায়, কখন ছিল বলা মুশকিল হলেও পরবর্তী জীবনব্যবস্থায় বর্তমান বিশ্ব ধর্ষণকে বেশ কয়েকটি ধরনে ভাগ করেছে; যেমন—গণধর্ষণ, বৈবাহিক ধর্ষণ, অজাচার ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ, কারাগারে ধর্ষণ এবং যুদ্ধকালীন ধর্ষণ। ধর্ষণ মানেই আমরা একজন নারীর সতর্কতা কিংবা অসতর্কতার বিষয়টির দিকে দৃষ্টিপাত করি। রেপ ক্রাইসিস (ইংল্যান্ড, ওয়েলস)-এর তথ্যানুযায়ী বিশ্ব জুড়ে অপরিচিত ব্যক্তিদের দ্বারা ধর্ষণের ঘটনার চেয়ে পরিচিত ব্যক্তিদের দ্বারা ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা বহুগুণ বেশি। সে ক্ষেত্রে গভীর রাতে নারীর নিরাপত্তার মনভোলানো বলা কথাটি একেবারেই অমূলক বই ভিন্ন কিছু নয়! পারিবারিক কলহের জের ধরে ধর্ষণের ঘটনা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, অন্তত আমাদের দেশে; আর নারীর পোশাকের কথাটি হরহামেশা শুনতে পেলেও আমাদের থমকে যেতে হয় পর্দাবৃত কোনো নারীর ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনায়। বিশ্ব জুড়ে কারাগারগুলোতে পুরুষ কর্তৃক পুরুষ ও নারী কর্তৃক নারী ধর্ষণের ঘটনাও সাধারণ, কিন্তু এ ধরনের ধর্ষণ সম্ভবত সবচেয়ে কম আলোচিত ধর্ষণগুলোর অন্তর্ভুক্ত। আন্তর্জাতিক সংঘাত বা যুদ্ধের সময়ও নিয়মতান্ত্রিক ও ব্যাপক হারে ধর্ষণ (যুদ্ধকালীন যৌন সহিংসতা ও যৌন দাসত্ব) ঘটতে পারে। এ ধরনের ঘটনাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় (একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আমাদের দেশে সংঘটিত)।

একজন ধর্ষকের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য নারী, শিশু কিংবা দুর্বল মানুষটির হাতে পদ্ম ফুলের মাঠ পেরিয়ে বেদনার্ত অস্ত্র তুলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন সচেতনতা। মেয়েশিশুটির নিরাপত্তায় আনন্দের অনন্ত ফোয়ারা পেতে ছেলে শিশুটিকে মানবিক গুণাবলিতে পূর্ণ একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে আমাদের। আজকের শিশু যেন একজন ধর্ষক মানসিকতার পুরুষে পরিণত না হয়, সেজন্য তাকে ঘর, অর্থাত্ পরিবার থেকেই প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। পুরুষালি আচরণের নামে পুরুষ ব্যক্তিটির দানবীয়তাকে প্রতিহত করতে হবে। পুরুষের মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘস্থায়ী ও স্বল্পস্থায়ী আলোচনা-সেমিনার-কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এর সফলতা কিংবা বিফলতাও দেখতে হবে। এক্ষেত্রে ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে বা শাস্তি বাড়িয়ে ধর্ষণের প্রবণতা কতটুকু কমবে—এই বিতর্কে সত্যিই প্রশ্ন থেকে যায়! কেবল আইন প্রয়োগ খুব কম সময়েই অপরাধ কমাতে পারে। অপরাধ সংঘটনের বিদ্যমান কারণগুলো দূর না করলে অপরাধ অব্যাহত থাকবে বই ভিন্ন কিছুই হবে না! তাইৃ নীলরঙা বোধের আগলভাঙা সন্ধ্যায় লালসার পড়ন্ত যাতনায় ব্যস্ত হয়ে সবশেষে বলতে পারি, ধর্ষণ প্রতিরোধে নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে আমাদের পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সম্মিলিত অঙ্গীকার দৃঢ় করতে না পারলে সব চেষ্টাই বিফল হয়ে পড়বে।

n লেখক :কথাসাহিত্যিক ও নারী নেত্রী