আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, বঙ্গবন্ধু শুধু জাতীয় নেতা নন, তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নেতা। জাতির পিতা সপরিবারে রক্ত দিয়ে বাঙালি জাতির রক্তের ঋণ শোধ করে গেছেন। জন্মশতবার্ষিকীতে বলতে চাই- জাতির পিতা, এই জাতি কোনোদিন আপনাকে ভুলবে না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপন উপলক্ষে সংসদের বিশেষ অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সোমবার যে প্রস্তাব এনেছেন সেটির ওপর গতকাল মঙ্গলবার আলোচনায় অংশ নিয়ে তোফায়েল আহমেদ একথা বলেন।
কারও কারও আপত্তির কারণে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফায় বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিটি অন্তর্ভূক্ত করা যায়নি বলে জানিয়ে তোফায়েল আহমেদ বলেন, আমাদের মত-পথের ভিন্নতা ছিল। তারপরও আমরা এক হতে পেরেছি। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফাকে আমরা ১১ দফায় অন্তর্ভূক্ত করেছি। ‘বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই’ এটা আমরা লিখতে পারিনি। কেউ কেউ আপত্তি করেছিলেন। এজন্য আমরা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার চেয়েছিলাম। তবে আমরা মনে করেছিলাম, এই দাবি এক দফায় চলে আসবে। ঠিকই পল্টনের জনসভার পর আন্দোলন এক দফায় পরিণত হলো।
তিনি বলেন, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি। আমি ওইদিন রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি ঘোষণা করেছি। ১০ লক্ষাধিক লোকের ২০ লক্ষাধিক হাত। আমি বঙ্গবন্ধুকে তুমি বলে বক্তব্য শুরু করলাম। প্রিয় নেতা, অনেক রক্তের বিনিময়ে তুমি আমাদের মধ্যে ফিরে এসেছো। তোমার কাছে বাঙালি জাতি ঋণী। কারগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসে তুমি বাংলার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা হূদয়ে অংকন করেছ। আমি বলেছিলাম- তোমার এ ঋণ আমরা কোনোদিন শোধ করতে পারবো না।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুর মামলা প্রত্যাহার হলো, ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে ৩২ নম্বরের বাসভবনে পৌঁছে দেওয়া হলো। বেগম মতিয়া চৌধুরী, মনি সিংহ ও বঙ্গবন্ধু একইদিনে মুক্তি লাভ করেছিলেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম পল্টনে না, পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুকে গণসংবর্ধনা দেবো।
তিনি বলেন, সেদিন আমি বলেছিলাম- কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞ চিত্তে তোমাকে একটি উপাধি দিয়ে বোঝা হালকা করতে চাই। নেতা তার জীবন আর যৌবন কাঁটিয়েছেন পাকিস্তানের কারাগারে। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও তিনি আপোষ করেননি। সেই মহান নেতাকে কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞ চিত্তে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হলো। বঙ্গবন্ধু ওই মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন যে, আমি গোলটেবিল বৈঠকে যাবো। ৬ দফা, ১১ দফা পেশ করবো। যদি না মানে আমি আবার ফিরে এসে সংগ্রাম করবো। গোলটেবিল বৈঠকে গেলেন, তারা দাবি মানলো না।
হামিদুল হক চৌধুরীর বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে তোফায়েল আহমেদ বলেন, গোলটেবিল বৈঠকে আইয়ুব খান বিভিন্নভাবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে বলেছিলেন, আপনি প্রধানমন্ত্রীত্ব নিন, আপনিই প্রধানমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধুু বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য আমি আসিনি। আমি এসেছি আমার বাংলার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। বঙ্গবন্ধু যখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বলেছিলেন আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না, সেটা মানুষ বিশ্বাস করেছিল। প্রধানমন্ত্রীত্বের বদলে তিনি ফাঁসির মঞ্চ বেছে নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু মুক্তি লাভ করলেন। আইয়ুবের পতন হলো। আইয়ুব খান ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন। তারপরে রাজনীতি নিষিদ্ধ। এরমধ্যেই নেত্রী (শেখ হাসিনা) সাক্ষী, বঙ্গবন্ধু লন্ডনে গেলেন অক্টোবর মাসে। নেত্রী ছিলেন ইতালি। তিনিও লন্ডনে ফিরে এলেন। সেখানে ভারতের প্রতিনিধি মনিন্দ্র নাথ ব্যানার্জীর সঙ্গে বৈঠক করলেন। তিনি পরিকল্পনা করলেন। আমাদের এসে বললেন। এরমধ্যেই ইয়াহিয়া খান ইলেকশন ঘোষণা করার পরে বললেন, তোমরা এখন অন্য কাজ করো।
বঙ্গবন্ধু হত্যকাণ্ডের নেপথ্যের খুনিদের খুঁজতে ট্রুথ কমিশন গঠন করুন: আ ক ম মোজাম্মেল হক
প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যা নিছক কোনো ব্যক্তির হত্যা ছিল না। স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অর্থাত্ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় যারা বিশ্বাস করেনি সেই অপশক্তিই এই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা। প্রত্যক্ষভাবে যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে তাদের বিচার হয়েছে। কিন্তু নেপথ্যের প্রকৃত খুনিদের বের করতে হবে। তাদের মুখোশ পৃথিবীর সামনে উন্মোচন করতে ট্রুথ কমিশন গঠন করতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে স্বাধীন বাংলাদেশ পেতাম না। বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন। আমাদের এই পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, আমাদের এই ভূখণ্ড, আমাদের মানচিত্র যতদিন থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু সমহিমায় বাস করতে থাকবেন। তিনি বলেন, খুনিরা যথার্থই বুঝতে পেরেছিল শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেই তাদের উদ্দেশ্য সফল হবে না, তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হত্যা করা। বাংলাদেশকে হত্যা করা। তাই কেবল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি তারা। তারা ১০ বছরের শিশু রাসেলকেও রেহাই দেয়নি। বঙ্গমাতাসহ পরিবারের কাউকেই রেহাই দেয়নি। তারা বুঝেছিল বঙ্গবন্ধুর রক্তের ছিটেফোটাও যদি থাকে তাকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতি আবার জেগে উঠবে, ঘুরে দাঁড়াবে।
আ ক ম মোজাম্মেল বলেন, বঙ্গবন্ধু যেদিন ফিরে এসেছিলেন সেদিন পত্রপত্রিকায় লেখা হয়েছিল ৫০ লাখ লোক না খেয়ে মারা যাবে, কোটি-কোটি বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দিয়েছিল। ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে বঙ্গবন্ধু দায়িত্ব পালন করে গেছেন। যদি বঙ্গবন্ধু ফিরে না আসতেন তাহলে কি মিত্র বাহিনী বাংলাদেশ থেকে যেত?
