সংবাদটি প্রকাশ পাইয়াছে ছোট আকারে। কিন্তু এই সংবাদের প্রতি আমাদের দৃষ্টি পড়িয়াছে বড় করিয়া। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে সমাজকর্ম বিভাগে মাস্টার্সের সান্ধ্য কোর্সে ভর্তি হইয়াছিলেন রওশন আলী। সম্প্রতি ফল প্রকাশে দেখা গিয়াছে, তিনি সিজিপিএ-৪-এর মধ্যে ৩.৫০ পেয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হইয়াছেন। সংবাদের মূল বিষয় হইল, এই কর্মটি করিয়াছেন তিনি জীবনে ৭০ বত্সর পার করিয়া। তাহার বয়স এখন ৭৩ বত্সর। জানা গিয়াছে, প্রথম জীবনে এইচএসসি পাশ করিয়া শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত হন। ইহার পর একসময় শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ২০০৮ সালে তিনি চাকুরি হইতে অবসর গ্রহণ করেন।
ইহা গোটা জাতির জন্য একটি বিশেষ শিক্ষণীয় ঘটনা। রওশন আলীর মতো কিছু মানুষ প্রমাণ করিয়া দেন—শিক্ষার কোনো বয়স নাই, শিক্ষা কেবল চাকুরি বা পেটের ভাত জোগাড় করিবার বিষয় নহে; শিক্ষা চেতনায় থাকিতে হয়। কী প্রয়োজন ছিল রওশন আলীর এই উচ্চ ডিগ্রি অর্জনের! তিনি তো এই বয়সে আসিয়া কোথাও চাকুরির দরখাস্ত করিবেন না! জাগতিক জীবনে তাহার এই শিক্ষা কোনো কাজে আসিবে বলিয়া মনে হয় না। কিন্তু এই ডিগ্রি অর্জনের মধ্য দিয়া যাহা হইল তাহা নিজে বিমুগ্ধ হইবার এবং অপরকে বিমুগ্ধ করিবার মতো বিষয়। নিশ্চয়ই তিনি বাকি জীবনে উচ্চশিক্ষিত হিসাবে, আত্মমর্যাদা লইয়া বাঁচিবার মনস্থ করিয়াছেন। অভিনন্দন রওশন আলীকে তাহার এই শিক্ষা অর্জন ও শিক্ষার মানসিকতা ধারণের জন্য। কদাচিত্ আমরা রওশন আলীর মতো তৃষিত মানুষ দেখিতে পাই। এই ক্ষেত্রে কর্নেল এস ডি আহমদের কথা উল্লেখ করা যাইতে পারে, যিনি দীর্ঘদিন সেনাবাহিনীতে চাকুরি করিয়াও চিকিত্সা, প্রকৌশল এবং আইনশাস্ত্রের উপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করিয়াছিলেন। ইহাকেই হয়তো বলা যায় শিক্ষার নেশা।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অনেক দুর্বলতার কথা আমরা জানি। সমগ্র জীবন ‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’ শুনিয়া শুনিয়াও যেই দেশে লক্ষ-কোটি তরুণ লেখাপড়া ছাড়িয়া দেয় এবং মূর্খের জীবনকে আনন্দে বরণ করিয়া লয়, সেই দেশে এস ডি আহমদ বা রওশন আলী অনুপ্রেরণা হইতে পারিত। কিন্তু হয় না। কারণ শিক্ষার সঙ্গে মানুষ আর্থিক লাভ-লোকসানকে জুড়িয়া দিয়াছে। যাহারা লেখাপড়া করিতেছেন তাহারাও ছুটিতেছেন সার্টিফিকেটের পিছনে। যখনই চাকুরির বয়স শেষ হইয়া যাইতেছে তখনই তাহারা সকল ধরনের লেখাপড়া হইতে ‘অবসর’ গ্রহণ করিতেছে। কাহারো আজ ইহা ভাবিবার মানসিকতা নাই যে, একজন শিক্ষিত মানুষ সমাজের একটি আলো। এই আলো যেথায় থাকুক, যত বয়সই হউক তিনি জ্বলিতে থাকেন। পূর্বে এই ভূমিতে অনেক মানুষের লেখাপড়ার সুযোগ হয় নাই আর্থিক অনটনের কারণে। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে প্রতিটি শিশুর লেখাপড়ার ন্যূনতম সুযোগ রহিয়াছে। কখনো তাহা সরকারের শিক্ষা পরিকল্পনার মধ্য দিয়া, কখনো বেসরকারি উদ্যোগে। এমনকি রাস্তার পাশের বস্তিতে যেই শিশুর জন্ম হইতেছে তাহার জন্যও আগাইয়া আসিতেছে কোনো প্রতিষ্ঠান। এই রকম অবস্থায়ও আমরা শিক্ষা হইতে ঝরিয়া পড়িতে দেখিতেছি লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী। দ্বিতীয়ত কেবল পেশার জন্য শিক্ষার মানসিকতা তৈরি হওয়ায় প্রকৃত শিক্ষা থাকিয়া যাইতেছে অধরা। অথচ আমরা অনুভব করিতে পারি, রাষ্ট্রের জন্য, সমাজের জন্য প্রয়োজন প্রকৃত শিক্ষিত জন, যাহার চেতনায় আছে শিক্ষা।
