একটি খতিয়ান, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ে চক্রান্ত

আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০২০, ২১:৪৯

মেজর (অব.) আহমেদ ফেরদৌস

বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডটির ইতিহাস হাঁটিহাঁটি পা পা করে প্রায় ৫০ বছর বা হাফ সেঞ্চুরি ছুঁইছুঁই করছে। জন্মলগ্ন থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্ম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ৭১-এর ২৬শে মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণের ক্ষণ থেকে অল্পস্বল্প প্রতিরোধের মাধ্যমেই অঙ্কুরিত হয় আজকের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর। সেই গর্বিত শুরুর পর থেকে আজ অবধি কালের পরিক্রমায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অঙ্কুর থেকে প্রস্ফুটিত হয়ে নীল পদ্মফুলে রূপ নিয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালি অফিসার ও জোয়ানদের ছোট ছোট দলের সমষ্টিগত যোগফল এবং মুক্তিকামী বাঙালি সন্তানদের মিলনক্ষণে শুরু হয় আজকের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পথ চলা।

বাঙালি জাতির ঐতিহাসিক বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ‘চির উন্নত মম শির’ অঙ্কিত পাহাড়ের চূড়ায় সবুজে ঘেরা চট্টগ্রামের ভাটিয়ারী পাহাড়ের কোলে অবস্থিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর Makers of Leaders-এর কারখানা খ্যাত বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি যা সংক্ষেপে ‘বিএমএ’ নামে পরিচিত। এই কারখানা থেকে উত্পাদিত পণ্য দ্বারাই আজ পরিচালিত আপনার আমার গর্বের ধন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বর্তমানে এই কারখানার ৮ম বিএমএ লং কোর্সের একজন লিডার আমাদের আজকের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সেনাপ্রধান যার নাম জেনারেল আজিজ আহমেদ। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৬তম সেনাপ্রধান এবং বিএমএ থেকে কমিশন্ডপ্রাপ্ত প্রথম সেনাপ্রধান।

লেখার প্রতিপাদ্য বিষয়ে ‘খতিয়ান’ শব্দটি ইচ্ছাকৃতভাবেই সংযোজিত। কেন করলাম সংযোজন? ভাবছেন সেনাবাহিনী পরিচালিত জলসিঁড়ি আবাসন এলাকার জমিসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে খতিয়ান? না ভাই, এ খতিয়ান অন্য চিত্রের। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্ম থেকে আজ অবধি কর্মরত অবস্থায় আত্মত্যাগকৃত অফিসার জোয়ানদের সমাধির খতিয়ান। স্বাধীনতা যুদ্ধ, পার্বত্য চট্টগ্রাম, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন ও অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে এই সেনাবাহিনীর মৃত্যুর খতিয়ানটিতে আমি সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাই আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণের।

কিছু তথ্যউপাত্ত দিয়ে বিশ্লেষণ করব খতিয়ানের বিষয়টি ধর্তব্যে নেওয়ার যৌক্তিক কারণসমূহ।

আমার পরিচয়, আমি 23 BMA Long কোর্সের একজন শপথধারী Leader। ১৯৯০ সালে সংবিধান রক্ষার শপথ আজও হূদয়ে স্পন্দন জাগায় বিধায় ২০১৪ সালে স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়ার পরও যখন প্রত্যক্ষ করি আমার অহংকারের জায়গায় কালিমা লেপনের অপচেষ্টা, তখন কলম-যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার তাগিদটা অনুভূত হয় অন্তর থেকে।

ইদানীং পরিলক্ষিত হচ্ছে কজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা বিদেশে নাগরিকত্ব নিয়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে সে দেশে স্থায়ী আবাসন গড়ে এতদিন আমাদের সেনাবাহিনী থেকে রেশনসহ সমস্ত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে You Tube & Social Media-য় প্রতিযোগিতায় নেমেছেন নিজেকে পরিচিত করাতে বা সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনে। এদের চ্যাঁচামেচি এতটাই বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে যে, জনগণ তাদের ভিডিওগুলো দেখে হো হো করে উচ্চৈঃস্বরে হেসে আনন্দ পাচ্ছেন। ভাঁড়ামো/কৌতুক অভিনেতা হিসেবে মেজর (অব.) দেলোয়ার (কানাডা), কর্নেল (অব.) শহীদ (ইউকে), সাংবাদিক ইলিয়াস (আমেরিকা), কনক সারওয়ার গংরা মিলে যৌথ প্রযোজনায় গ্রামগঞ্জের মানুষকে বিনে পয়সায় এন্টারটেইনিং করছেন বিধায় তাদের জানাই আন্তরিক অভিনন্দন!

এই গং বাংলাদেশের ইজ্জত সম্মান মাটিতে নামাতে মরণ কামড় দিয়ে উঠেপড়ে লেগেছে। তারা নিজেরাও অবগত নন যে, তারা ব্যবহূত হচ্ছেন বহিঃশক্তির বাংলাদেশ বিরোধী দ্বারা। করুণা ও মায়া হয় এদের জন্য।

কারো ব্যক্তিগত চরিত্র হনন আমার পছন্দ নয় বিধায় এসব কুচক্রী So Called Social Media Star দের নিয়ে বিশ্লেষণ করার ঘোরতর বিপক্ষে বিধায় তাদের পরিহার করার পক্ষে। তবে সুচরিত্রবান ব্যক্তি যেমন আমার ঢাকা কলেজের শিক্ষক প্রফেসর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার যদি কিছু বলেন, তবে তা আমলে নিতাম অবশ্যই; কিন্তু এই গংয়ের চরিত্র যেহেতু ধুতুরা বিষের মতো অপবিত্র, তাই তাদের আলোচনায় প্রাধান্য দিলে তাদেরকে অতি মূল্যায়ন করা হবে।

গত দুই মাস ধরে নীরবে এদের অত্যাচারের মাত্রা যখন সহ্যের সীমা অতিক্রম করেছে, তখন ইউটিউব ও ফেসবুকে যাতায়াত সীমিত করে ফেলেছি।

ভাবছিলাম, এই ক্লাউনগুদের Motive কী হতে পারে? আমার মূল্যায়ন, এরা তুরুপের তাস বই কিছু নয়। ভাত ছিটালে যেমন কাকের অভাব হয় না, তেমনি তাদের পরিকল্পনাদাতা গোষ্ঠী এদের কিছু উন্নত জাতের চাল ছিটিয়ে পোষ মানাতে পেরেছে।

What May be Their Motives?

১। বাংলাদেশ যখন করোনা অতিক্রম করেও উন্নয়ন ধারায় সুপার স্পিডে চলমান, তখন ১/১১-এর মতো কিছু করতে পারলে সহজেই বাংলাদেশকে আবার ২০ বছর পিছনে নেওয়া সহজতর। সেরকম পরিস্থিতি সৃষ্টির উপকরণ তৈরি করতে তারা ভালোই হোমওয়ার্ক করে নেমেছে। এখন আমাদের বাংলাদেশি সাধারণ জনগণকে ভাবতে হবে, আমরা কি আরেকটি ১/১১ চাই, নাকি চাই টেকসই উন্নয়ন চাই?

২। বাংলাদেশের মানুষের বিশ্বাসের ভীত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে এবং জনগণকে উসকে দিয়ে ফায়দা লুটতে চায় যে অপশক্তি, তাকে আমজনতা প্রতিহত করবে, নাকি বাড়তে দেবে তা আমাদের একান্ত বাংলাদেশের জনগণের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।

৩। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ে ষড়যন্ত্র ও প্রপাগান্ডা আমরা বরদাস্ত করতে পারি না। তাই দেশের   প্রতিটি মানুষের কাছে বিনয়ের সঙ্গে আর্জি থাকবে আমরা যা-ই করি বা করব না কেনো, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে রাখব সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে। এই শপথ নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী বাংলাদেশি জনগণকে এক পতাকার নিচে মুক্ত আলোচনায় আসতে আহ্বান জানিয়ে আপনাদের বিচারবুদ্ধি দিয়ে বিষয়টি আমলে নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানাই।

ভালো থাকুক বাংলাদেশ। ভালো থাকি আমরা।

n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা