করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এবং করণীয়

আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০২০, ২১:৫০

মোহম্মদ শাহিন

সামনে শীত, সেই সঙ্গে বাড়ছে বায়ুদূষণের প্রকোপ। শীত ও বায়ুদূষণে অধিকতর সংক্রমণের আশঙ্কা। সব মিলিয়ে দেশে করোনার প্রথম ঢেউ শেষ হতে না হতেই দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে উত্কণ্ঠার শেষ নেই। ইতিমধ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে নাস্তানাবুদ অবস্থা তৈরি হয়েছে, সঙ্গে লকডাউনও ঘোষণা করেছে ইউরোপের ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও জার্মানিতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও একই অবস্থা বিরাজমান। এসব দেশে দ্বিতীয় দফায় প্রথম ধাপের চেয়ে সংক্রমণ বেশি হচ্ছেন—এমনটাই জানাচ্ছেন দেশের সংবাদমাধ্যম।

আসন্ন শীতে দেশে করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে অনেক আগে থেকেই আভাস দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও শীতের সঙ্গে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তার বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য এখনো স্পষ্ট নয়। তবে দেশে শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে সংক্রমণ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেখা দিতে শুরু করেছে। গত দুই মাস ধরে করোনা সংক্রমণের হার নিম্নমুখী থাকলেও হঠাত্ করেই গেল সপ্তাহে ফের সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় অনেকে শঙ্কিত হয়ে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কথা বলছেন। যদিও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে তা বলার মতো পরিস্থিত হয়নি। তবে এ অবস্থা আর কিছুদিন বিরাজমান থাকলে নিশ্চিত হওয়া যাবে যে দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে।

করোনা আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হলো ফুসফুস। আর শীতকাল এলেই আমাদের দেশের মানুষের ফুসফুসজনিত সমস্যা প্রকট হয়। যেমন—হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, ফ্লু, নিউমোনিয়া ইত্যাদির প্রকোপে আমরা দিশেহারা হয়ে যাই। চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা বলছেন, যে কোনো ভাইরাস শীত ও শুষ্ক আবহাওয়ায় অধিকতর বিস্তার লাভে সক্ষম। আর শীত মৌসুমে আবহাওয়া শুষ্ক ও ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ থাকায় বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বেশি থাকে। ফলে করোনা ভাইরাস দ্রুত ছড়ানোর সম্ভাবনার আশঙ্কা রয়েছে।

শীত যখন পুরোপুরি শুরু হবে তখন আমাদের পক্ষ থেকে করোনা মোকাবিলার জন্য যেটা সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়তে পারে তাহলো স্বাস্থ্যসেবা এবং মানুষকে সুরক্ষিত করার ব্যবস্থা করা। সব মিলিয়ে আমাদের কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ এখন যেন সময়ের দাবি হয়ে গেছে।

 প্রথমত, সরকার ইতিমধ্যে ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ নীতি গ্রহণ করেছে। এ প্রত্যয়টি অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু বাস্তবিকভাবে তা আদৌ পালন করা হচ্ছে কি না, তা তদারকি করতে হবে। অভিযোগ আসছে মাস্ক ছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় সেবা মিলছে। সুতরাং সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, হাসপাতাল ও অফিস-আদালতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে কড়া নজর দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সম্প্রতি দেশে বায়ুদূষণের প্রকোপ বাড়ছে। আর এ বায়ুদূষণ করোনা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করতে পারে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই, বায়ুদূষণ রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ পদক্ষেপ জরুরি।

তৃতীয়ত, গ্রামাঞ্চলে সচেতনতা বাড়াতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। কেননা, গ্রামাঞ্চলের মানুষ বেশ ধর্মভীরু। আর গ্রামে প্রশাসন থেকে ধর্মীয় গুরুদের দিকনির্দেশনা ভালো ফল নিয়ে আসবে। এ ক্ষেত্রে নামাজ বা পূজার পর ইমাম বা পুরোহিত কর্তৃক মাস্ক পরিধান, সাবান দিয়ে হাত ধোঁয়া, জ্বর হলে করোনা টেস্ট করানো, হাঁচি বা কাঁশি হলে হাত মুখে চেপে কিংবা কুনুই ব্যবহার করে ঠেকানো ইত্যাদি বিষয়গুলো ওপরমহল থেকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি ওয়াকিবহাল করতে হবে।

চতুর্থত, প্রতিদিন প্রবাসী শ্রমিকরা বিভিন্ন দেশ থেকে ফিরছেন। এক্ষেত্রে তাদের কোয়ারেন্টাইনের ওপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তাছাড়া, শীতকালে আমাদের দেশে বিভিন্ন উত্সব, অনুষ্ঠান বেড়ে যায়। এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক কড়া নজর রাখতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। নিজের সচেতনার পাশাপাশি পরিবারের শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রতি আমাদের সুদৃষ্টি প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে—সরকারের একার পক্ষে এটি সামাল দেওয়া সম্ভবপর নয়; দরকার সমন্বিত পদক্ষেপ।  সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ এবং জনগণের সচেতনতা ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় দ্বিতীয় ঢেউ প্রতিরোধে বাংলাদেশ সক্ষম হবে—এমনটাই প্রত্যাশা।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়