সত্বন্ধু ইহকাল-পরকালের সম্পদ

আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২০, ১৮:৫৮

বাংলা ভাষায় একটি ভাবসম্প্রসারণ আছে—‘সত্সঙ্গে স্বর্গবাস, অসত্সঙ্গে সর্বনাশ।’ আসলে একটি মন হচ্ছে আরেকটি মনের যোগাযোগমাধ্যম। মানুষ সত্মনের মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা করলে, তার মনের যোগাযোগও হবে একটি স্বচ্ছ মনের সঙ্গে। আর অসত্ লোকদের সঙ্গে ওঠাবসা করলে তার মনের যোগাযোগ হবে একটি অন্ধকার মনের সঙ্গে। যার প্রভাবে তার মনেও আস্তে আস্তে অন্ধকার নেমে আসতে পারে। বুখারীর এক বর্ণনায় এসেছে, নবি করীম (স) বলেন—‘সত্সঙ্গী ও অসত্সঙ্গীর উপমা হলো কস্তুরী বহনকারী আতর বিক্রেতা ও কামারের হাঁপরের মতো। আতর বিক্রেতা হয়তো তোমাকে কিছু দান করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি কিছু খরিদ করবে অথবা তুমি তার থেকে সুবাস লাভ করবে। অপরদিকে কামারের হাপর হয়তো তোমার কাপড় জ্বালিয়ে দেবে কিংবা তুমি তার থেকে দুর্গন্ধ পাবে।’ বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে নবি করীম (স) আমাদের যে নির্দেশনা দিলেন তা আমাদের অবশ্যই মেনে চলা উচিত। নতুবা আমরা বড় ক্ষতির সম্মুখীন হব। আসলে যে কাউকে বন্ধু বলা যায় না এবং বন্ধু বানানো যায় না। সত্যবাদী, নামাজি, দ্বীনদার, আল্লাহওয়ালা, পরোপকারী ব্যক্তিকে বন্ধু হিসেবে নির্বাচন করা উচিত। সুরা কাহাফের ২৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা তার প্রিয় হাবীবকে নির্দেশনা দিয়ে বলেন—‘আপনি নিজেকে তাদের সংসর্গে আবদ্ধ রাখুন, যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের রবকে তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশে ডাকে আর আপনি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে তাদের থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না। যার মনকে আমার স্মরণ থেকে অবচেতন করে দিয়েছি, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে, আপনি তার আনুগত্য করবেন না।’বন্ধুু নির্বাচনে কেমন ব্যক্তি অগ্রাধিকার পাবে সে প্রসঙ্গে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা সুরা তাওবার ১১৯ নম্বর আয়াতে বান্দাকে নির্দেশ করে বলেন—‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও।’ হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী (রহ) বলেন, যার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে তার মধ্যে পাঁচটি গুণ থাকা চাই। তা হলো—‘বুদ্ধিমত্তা ও সত্স্বভাবের অধিকারী হওয়া এবং পাপাচারী, বেদআতি ও দুনিয়াসক্ত না হওয়া।’ হঠাত্ করে কারো সঙ্গে পরিচিত হবার মধ্য দিয়ে অর্থাত্ কোনোরকম বিচার বিশ্লেষণ ছাড়া বন্ধুত্ব গড়ে ওঠলে অনেক সময় দুঃখজনক পরিণতি ঘটতে পারে। বর্তমান ইন্টারনেট জগতে যা অহরহ ঘটছে। এ ক্ষেত্রে আমরা নিজেরা সতর্ক থাকব, আমাদের সন্তানদেরও রক্ষা করব। মাতা-পিতার কর্তব্য হচ্ছে সন্তানদের জন্য সত্স্বভাবের বন্ধু নির্বাচন করে দেওয়া। অসত্ বন্ধুর কারণে আমাদের সন্তানদের সোনালী ভবিষ্যত্ যেন হারিয়ে না যায় সেদিকে অবশ্যই সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বন্ধুত্ব শুধু ইহজগতের সম্পদ নয়। অনেক সময় বন্ধু পরকালেরও খোরাক জোগায়। তাই বন্ধুত্ব গড়তে সচেতন থাকতে হবে। ভালো সঙ্গী ও বন্ধুর সাহচর্যে যেমন ইহকাল ও পরকালে মুক্তি পাবার সম্ভাবনা থাকে, তেমনি মন্দ সঙ্গী ও বন্ধুর কারণে দুনিয়া ও আখেরাত বরবাদ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

বন্ধুত্বের গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো সততা রক্ষা করা। ইমাম হাসান (রাযি)-এর কাছে একদিন এক ব্যক্তি এসে বললেন, আমি আপনার বন্ধু হতে চাই। ইমাম ঐ ব্যক্তির চেহারার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন এবং ইতিবাচক সাড়া দিয়ে বললেন- ‘আমি তোমাকে আমার বন্ধুর মর্যাদায় অভিষিক্ত করব তবে কয়েকটি শর্ত আছে যেগুলো আমার সঙ্গে বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে অবশ্যই রক্ষা করে চলতে হবে।’ লোকটি ইমামের শর্ত মানার প্রতিশ্রুতি দিল। ইমাম তখন বললেন—‘আমার বন্ধু হতে চাইলে আমার গুণকীর্তন গাইতে পারবে না, কারণ আমি নিজের ব্যাপারে ভালোভাবেই সচেতন। কখনো আমাকে মিথ্যা বলবে না, কেন না মিথ্যার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। একইভাবে আমার কাছে কারো গীবত বলতে পারবে না।’ লোকটি এসব কথা শুনে চুপ হয়ে গেল।

আমাদের উচিত হবে জীবনের এই উজ্জ্বল সময়ে যাকে তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করা। ছাত্রছাত্রীদের জন্য ছাত্রজীবনে বন্ধু হওয়া উচিত, তবে সে বন্ধু হতে হবে সত্, বুদ্ধিমান, মেধাবী, ধৈর্যশীল, চরিত্রবান, ধার্মিক, সুন্দর মনের অধিকারী ও পরোপকারী বন্ধু। একজন ভালো বন্ধুই পারে পালটে দিতে আপনার জীবন, পরিবারের জীবন এমনকি সমগ্র জাতির জীবন। আল্লাহ আমাদের সত্ ও যোগ্য বন্ধুর সাহচর্য লাভ করে জীবনকে সুন্দররূপে গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন।—আমীন!

l লেখক :বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ

বেতারের ধর্মীয় উপস্থাপক ও আলোচক