সাহিত্য ও চলচ্চিত্র

আন্তঃসম্পর্কের স্বরূপ

আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২০, ২১:০১

ভাষা ও সাহিত্যের মতো চলচ্চিত্রের ইতিহাস এত পুরাতন নয়। বলা যায় এটি শিল্পের একটি নবীন শাখা। তবে চিত্রে গতিময়তা আনার প্রচেষ্টা গুহাচিত্রের আমল থেকেই শুরু হয়েছে। পুরাতন প্রস্তরযুগে, প্রায় সাড়ে আঠারো হাজার বছর আগে প্রাচীন স্পেনের আলতামিরা গুহাচিত্রে ধাবমান বাইসন বোঝাতে এর ছয়টি পা এঁকে ছবিকে গতিময় করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এটিই বিশ্বের প্রথম চলচ্চিত্র সৃষ্টি-প্রয়াসের প্রামাণ্য দলিল। এরও অনেক আগে থেকে মানুষ তার চোখের সামনে প্রত্যহ ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি হুবহু চিত্রে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে আসছে। বহুদিনের বহু লোকের চেষ্টার ফলে স্থিরচিত্রের গতিময় রূপ থেকে চলচ্চিত্রের সার্থক নির্মাণ মাত্র একশ বছরের কিছু অধিককাল আগের ঘটনা। কিন্তু এই অল্প সময়ে মানুষ ও সমাজের ওপর এর প্রভাব ব্যাপকতা লাভ করে। তাই, অল্প সময়েই একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্র স্বীকৃতি লাভ করেছে।

চলচ্চিত্র একটি মিশ্রশিল্প। ক্যামেরা এর প্রধান উপায় বা বাহন। কারিগরি দিক ছাড়া কাহিনি বা প্লট এর প্রধান উপাদান। সাহিত্যের মতো চলচ্চিত্রের সাফল্য-ব্যর্থতা শুধুমাত্র কাহিনির ওপর নির্ভর করে না। সামগ্রিক সফলতা নির্ভর করে অভিনয়, পরিচালনা, সম্পাদনা ও অন্যান্য প্রযুক্তির ব্যবহারে। সাহিত্যের প্রধান বাহন শব্দ। একের পর এক শব্দ বুনে সাহিত্যিক তার মনের ভাব প্রকাশ করেন। চলচ্চিত্রের মূল উপাদান হচ্ছে ইমেজ বা ছবি। ছবি সেখানে কথা বলে। ছবির পর ছবি সাজিয়ে চলচ্চিত্রকার একটি  ঘটনা বা বিষয়কে চিত্রায়িত করেন। চলচ্চিত্র হচ্ছে সমাজের ঘটনানির্ভর জীবনপ্রণালী ও সংস্কৃতির চিত্রিতরূপ। তেমনি, সাহিত্যও একটি সমাজের ঘটনাবহুল জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির বর্ণিতরূপ। চলচ্চিত্রের পরিচয়জ্ঞাপক অভিধা একাধিক। মুভ করে বলে ইংরেজিতে একে বলা হয় মুভি। সিনেমাটোস্কোপে নির্মিত হতো বলে এর নামকরণ হয়েছে সিনেমা। ফিল্মে ধারণ করা হয় বলে ফিল্ম। ছবির সাহায্যে গল্প বলা হয় বলে একে ছবিও বলা হয়। এমনকি বইয়ের গল্প (সাহিত্য) থেকে চলচ্চিত্র নির্মিত হয় বলে বাংলায় কিছুকাল আগেও সিনেমাকে বই বলে শনাক্ত করা হতো।

বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্নজন চলচ্চিত্র দেখানোর চেষ্টা করলেও এ কাজে প্রথম সফল হন লুমিয়ের ব্রাদার্স। ১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর, ফ্রান্সের গ্র্যান্ড ক্যাফে ইন প্যারিস-এ চলচ্চিত্রের দুই আদি পুরুষ অগাস্ত লুমিয়ের এবং লুই লুমিয়ের প্রথম দর্শকদের সামনে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেন। বিশ্বের ইতিহাসে যাত্রা শুরু হয় এক বিস্ময়কর শিল্পের। যদিও চলচ্চিত্র শুরুর প্রথম দিকে এটি ছিল শুধুই বৈজ্ঞানিক চমক। এমনকি লুমিয়ের ভাইদের কাছেও। পর্দায় মানুষ, প্রাণী বা কোনো বস্তুর গতিময়তা দর্শককে বিমোহিত করত। এই চমকের ঘোর কাটতে তাদের বেশিদিন সময় লাগল না। সংশ্লিষ্টরা জানেন, ভাষাসৃষ্টির ইতিহাস কত দীর্ঘ ও জটিল। কিন্তু বর্তমানে একটি শিশু যে ভাষাগোষ্ঠীতেই জন্মাক না কেন, সে তার শ্বাসকার্যের মতো স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই ভাষা আয়ত্ত করে নেয়। চলচ্চিত্রের আবিষ্কারও তেমনি বহু জটিল পথ পাড়ি দিয়ে লুমিয়েরদের হাতে সফলতা পেলেও কিছুদিনের মধ্যেই তা মানুষের কাছে প্রাত্যহিক ঘটনার মতোই স্বাভাবিক হয়ে যায়। অথচ প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শনের দিন দর্শকরা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়েছিলেন। সাধারণের কাছে বিস্ময় কেটে গেলে ১৯০০ সাল নাগাদ লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় চলচ্চিত্রের প্রতি তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং বিদায় নেন চলচ্চিত্র ব্যবসা থেকে।

আবিষ্কারের শুরুতে চলচ্চিত্র ছিল পরিচালক বা ব্যবসায়ীদের কাছে শুধুই অর্থ উপার্জনের উপায়, সার্কাস বা ম্যাজিকের মতোই বাণিজ্য করার নতুন উপকরণ মাত্র; অনেকটা বেচাকেনার হাটে রোজগারের পণ্য হিসেবেই এর জন্ম। ফলে, Art অর্থে শিল্প হয়ে ওঠার আগে এটি Industry অর্থে শিল্প হয়ে ওঠে। বৈজ্ঞানিক চমক কেটে গেলে চলচ্চিত্রকাররা দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে বেছে নেন পর্দায় ছোট ছোট কাহিনিচিত্র বা তথ্যচিত্র দেখানো। চলচ্চিত্রে গল্পবলার এই যে প্রয়াস—তা থেকে সাহিত্যের সঙ্গে এর একধরনের বন্ধন তৈরি হয়ে যায়। এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গল্পচিত্রেও দর্শকদের মন বেশিদিন তৃপ্ত রইল না। পরবর্তীকালে ফরাসি চলচ্চিত্রকার মেলিয়েঁ এক শটের গল্প বলা থেকে বহু শট বিভাজনে গল্প বলার রীতি তৈরি করেন। কিন্তু দর্শকরা চলচ্চিত্রের কাছে আরো বেশি কিছু প্রত্যাশা করতে থাকল। ঠিক যেমনি সাহিত্যে বলা হয় মানুষের গল্প, মানবিকতার গল্প, জীবনের গল্প—সে রকম।

সাহিত্যের গল্পগুলোকে একসময় চলচ্চিত্রকাররা পর্দায় জীবন্ত করতে শুরু করলেন। দর্শকরা নতুন করে চলচ্চিত্রে অন্যরকম ভালোলাগার সন্ধান পেলেন। আর এই ভালোলাগার জোগান দিতে চলচ্চিত্রকাররা নতুন নতুন কাহিনির খোঁজে বারবার সাহিত্যের কাছে যেতে শুরু করলেন। তখনো চলচ্চিত্র ছিল শুধুই ব্যবসায়িক পণ্য। আস্তে আস্তে এর সাথে শিল্পচেতনা যোগ হতে লাগল। চলচ্চিত্রকাররাও চেষ্টা শুরু করলেন—কীভাবে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একে অধিকতর নান্দনিক করা যায়। কালক্রমে এটি শিল্পরূপ ধারণ করল। কিন্তু চলচ্চিত্র অত্যন্ত ব্যয়বহুল মাধ্যম। ফলে শিল্পগুণ রক্ষার পাশাপাশি এতে বিনিয়োগের টাকা লাভসহ ফেরত আসা অর্থাত্ এর ব্যবসায়িক দিকটিও মাথায় রাখতে হয়েছে। তাই চলচ্চিত্রকাররাও ঐ সময়ে বিনিয়োগের ঝুঁকি এড়াতে পাঠকনন্দিত সাহিত্যকর্মগুলোকে চিত্রায়িত করতে বেশি আগ্রহী হলেন। যার ধারাবাহিকতা এখনো বিদ্যমান। কি নির্বাক, কি সবাক উভয় যুগের শুরু থেকেই চলচ্চিত্রকাররা মনে করলেন, যে সাহিত্যগুলো জনপ্রিয় তা থেকে সিনেমা করলে জনপ্রিয়তা আসতে পারে। দ্বিতীয়ত, সাহিত্যের মধ্যে এত ভালো সিনেমাটিক উপাদান আছে, গল্প আছে—সেই গল্পগুলোকে যদি তুলে আনা যায় তাহলে ভালো একটি চিত্রনাট্য তৈরি হতে পারে।

শত বছরের ব্যবধানে সাহিত্যের কাঠামো থেকে বেরিয়ে চলচ্চিত্র আজ আলাদা শিল্পমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তারপরও শিল্পের অন্যান্য শাখার চেয়ে সাহিত্যের সাথেই এর ঘনিষ্ঠতা এখনো সবচেয়ে বেশি। চলচ্চিত্রের ইতিহাসের প্রায় শুরু থেকেই সাহিত্যের সাথে চলচ্চিত্রের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শিল্পের অন্য কোনো শাখার সাথে সাহিত্যের সম্পর্ক নিয়ে এত আলোচনা বা প্রশ্ন উত্থিত হয়নি। সংগীত, চিত্রকলা, থিয়েটার বা মঞ্চনাটক এগুলো আলাদা শিল্পমাধ্যম হিসেবে বহু আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা দর্শক বা শ্রোতা আছে। যদিও নাটকের লিখিত রূপ আছে এবং তা সাহিত্যেরই একটি শাখা। তবুও এর একটি আলাদা রূপকল্প (Form) তৈরি হয়ে গেছে এবং দর্শকরাও স্বতন্ত্ররূপে এটিকে মেনে নিয়েছেন। কিন্তু নাটকের মতো চলচ্চিত্র কোনো লিখিত শিল্প নয়। এ কারণে চলচ্চিত্র সাহিত্যের শাখা হিসেবে কখনো গণ্য হতে পারে না। চলচ্চিত্রও কখনো সাহিত্যের দাবি নিয়ে হাজির হয়নি। সাহিত্যের কাছে বারবার এসেছে শুধু কাহিনির প্রয়োজনে। শিল্পের এক শাখার সাথে আরেক শাখার পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া কোনো মাধ্যমকেই ছোট করে না। নিজের সমৃদ্ধির খাতিরে এই আদান-প্রদান শিল্পে একটি স্বীকৃত উপায়।

সাহিত্যের সাথে চলচ্চিত্রের পার্থক্য এখানেই যে, সাহিত্যে এর রচয়িতার বর্ণনার বাইরেও পাঠক তার নিজস্বানুভূতি দিয়ে কল্পনায় ইচ্ছেমতো চলচ্ছবি তৈরি করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে পাঠক সম্পূর্ণ স্বাধীন। অন্যদিকে চলচ্চিত্রের রয়েছে এক সম্মোহনী ক্ষমতা। পরিচালক সম্মোহনকারীর মতো তার কথা, দৃষ্টিভঙ্গি গল্পচ্ছলে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শকদের দেখিয়ে নেন। দর্শকের কল্পনা এদিক থেকে শৃঙ্খলিত। চলচ্চিত্রকারের দৃষ্টিভঙ্গির ওপরেই তাদের নির্ভর করতে হয়। সাহিত্য ও চিত্রনাট্য রচনার মধ্যেও পদ্ধতিগত অনেক পার্থক্য আছে। সাহিত্য রচনায় লেখকের সাহিত্যবোধ ও ভাষাজ্ঞান আবশ্যক। কিন্তু চিত্রনাট্য রচনায় সাহিত্যবোধ ও ভাষাজ্ঞান ছাড়াও চলচ্চিত্রবোধ, চলচ্চিত্র নির্মাণের টেকনিক ও কারিগরি জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। কেননা সাহিত্য শুধু ঘটনার বর্ণনা করলেও চিত্রনাট্যে কাহিনি বুননের জন্য সংলাপ, ক্যামেরার কোণ প্রয়োগের নির্দেশনা, আলো ব্যবহারের কৌশল, অভিনেতা-অভিনেত্রীর এক্সপ্রেশন, সময়, লোকেশন ইত্যাদি সবিস্তারে চিত্রনাট্যকারকে বর্ণনা করতে হয়। চলচ্চিত্রের জটিল মাধ্যমে পরিচালকও সবসময় শতভাগ নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে ছবি নির্মাণ করতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে ক্যামেরাম্যান, অভিনেতা-অভিনেত্রী, প্রকৃতি ও প্রকৃত অবস্থা সর্বোপরি সম্পাদকের কাছে তার ইচ্ছাও কখনো কখনো জলাঞ্জলি দিতে হয়।

অনেকে মনে করেন, সাহিত্যের সাথে চলচ্চিত্রের আদান-প্রদান বলতে গেলে প্রায় একপাক্ষিক। সাহিত্য শুধু গল্প-সংলাপ দিয়ে যাচ্ছে, চলচ্চিত্র তা গ্রহণ করছে। আবার এ কথাও স্বীকার্য যে, চলচ্চিত্রে সাহিত্যের সফল পরিণতি—অন্তরালে চলচ্চিত্র কিছুটা হলেও সাহিত্যকে প্রভাবান্বিত করছে। অনেক সাহিত্যিকও তাদের গল্প-উপন্যাসকে চলচ্চিত্রধর্মী করে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তাদের কাছে ফিল্ম-রাইটের মোহ অত্যন্ত লোভনীয়। তারা সাহিত্যে চলচ্চিত্রের ভিজ্যুয়াল দিকটি ফুটিয়ে তুলতে চান বর্ণনার মাধ্যমে। বর্ণনার ধরনও এমন হয় যে, চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য তা এমন সহজপাচ্য যে প্রায় চিত্রনাট্যের শামিল। ফলে চলচ্চিত্রকাররা এমন তৈরি জিনিস পেয়ে লুফে নেন। তারা শুধুমাত্র এটিতে গতি সঞ্চার করে দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তোলেন। এক্ষেত্রে সাহিত্য ভাব ও ভাষাগত ছবি তৈরি করে, চলচ্চিত্র দৃশ্য-শ্রাব্য ইমেজ নির্মাণ করে। সাহিত্যে যা মনোগত— চলচ্চিত্রে তা দৃশ্যগত। তবে সাহিত্য ন্যারেটিভ থেকে ফিল্ম ন্যারেটিভে রূপান্তরের সময় মনে রাখতে হবে যে—সাহিত্য ও চলচ্চিত্র উভয়ই আলাদা মাধ্যম, একটির সঙ্গে অন্যটির পারস্পরিক আদান-প্রদান হতে পারে, হুবহু অনুকরণ নয়। এটাই এই দুইয়ের সম্পর্কের মূল কথা।