রাজীবদের বাড়িতে একটা বিশাল আমগাছ আছে। আমগাছটা হলো তার খেলার সঙ্গী। খেলা মানে জানালার ধারে খাটে বসে রাজীব খেলে আর আমগাছ গলা বাড়িয়ে, মানে ডালগুলো আরো একটু ঝুঁকিয়ে দিয়ে দেখে। দুজনে প্রচুর গল্পও করে। কেউ ডাল ভেঙে নিলে গাছ রাজীবকে বলে, ‘আমার অনেক ব্যথা লেগেছে।’ কেউ দোলনা ঝোলালে বলে, ‘আমার কষ্ট হচ্ছে।’
রাজীব যখন মায়ের কোনো খুব কাজের জিনিস নষ্ট করে ফেলে বকুনি খায়, তখন রাজীবও গাছের কাছে নালিশ করে।
আমগাছে সারাদিনই কাকেরা এসে বসে। একটা কাক প্রায়ই রাজীবকে দেখে জুলজুল চোখে। সুযোগ পেলেই জানালা গলে ঘরে ঢুকে কেক কিংবা চিপস নিয়ে পালায়। একদিন সেই কাকটার সাথে আরো এক কাক ঠোঁটে করে জংধরা তার, টুকরো দড়ি, মরা ডাল এরকম আরো আগড়ুমবাগড়ুম কত কি নিয়ে এসে রাখছে গাছের ডালে। গাছ কিছু বলছে না দেখে রাজীব বলল, ‘তুমি কাকদের তাড়িয়ে দিচ্ছ না কেন?’
‘তাড়াবো কেন? ওরা তো বাসা বানাচ্ছে। ক’দিন পরে ডিম দেবে। বাচ্চা ফোটাবে।’
‘তা হোক, বড়ো বিচ্ছিরি ওর বাসাটা!’
‘হুঁ, পাখিদের মধ্যে কাকই বাসা বানায় সবচেয়ে খারাপ। সামনে যা পায় তা-ই নিয়ে আসে বাসা বানাতে। ওদের বাসায় সাবান পর্যন্ত পাওয়া যায়।’
একদিন রাজীব বলে, ‘জানো, আমার খুব আনন্দ হচ্ছে আজ।’
‘তা-ই নাকি? কেন আনন্দ হচ্ছে?’
‘ছোট মামা আসবে।’
‘তা-ই নাকি? তবে তো তোমার ভারি মজা। মামার সাথে অনেক ঘুরবে নিশ্চয়।’
‘মামার সাথে যা যা মজা করব সব তোমাকে বলব। তুমি যেতে পারলে তোমাকেও সাথে নিতাম।’
আমগাছ বলল, ‘কী আর করা বলো? গাছেদের তো এরকমই জীবন!’
মামা আসার পর রাজীব আমগাছের কথা প্রায় ভুলেই গেল। মামার সাথে রোজই বেড়ানো চলছে। মামা খুব ভালো। খুব হাসাতে পারে। আর রাজীব যা খেতে চায় তা তখনি কিনে দেয়। মা রাগ করে, বারণ করে, কিছুই কানে নেয় না। মামা-ভাগ্নের তাই ভারি মিল। একই ঘরে থাকছে, ঘুমাচ্ছে দুজনে।
এরমধ্যে রাজীবের একটু ঠান্ডা জ্বর হলো। জ্বরের দাপটে রাজীব কাহিল। দু’দিন পরে জ্বর ছাড়লেও মামার সাথে ঘোরাঘুরি বাদ পড়ল।
একদিন সন্ধ্যায় মামার হাতঘড়িটা আর খুঁজে পাচ্ছে না কেউ। মা এসে ধরল রাজীবকে।
‘ঘড়িটা কোথায়, রাজীব?’
রাজীব বলল, ‘আমি জানি না।’
বাবা বলল, ‘বাবু সোনা, ঘড়িটা মামার খুব প্রিয়। খুলে-টুলে দেখে থাক যদি কিংবা হাত থেকে পড়ে গিয়ে যদি কাচটা ভেঙেও থাকে তবু দিয়ে দাও। মামা ঠিক করে নেবে।’
রাজীব বলল, ‘নিইনি বাবা, কিছু করিনি।’
মা বলল, ‘রাজীব, যদি ঘড়িটা না দাও তবে আমি আর তোমার মা হবো না।’
‘প্লিজ, মা, আমি নিইনি।’
নতুন কিছু পেলে সেটা খুলে-টুলে দেখতে রাজীবের ভালো লাগে। প্রায়ই এসব করে মা’র কাছে বকুনিও খায়, কিন্তু এদিন সত্যি রাজীব মামার ঘড়ি নিয়ে কিছু করেনি। কিন্তু বাবা-মা কাউকে সে সেটা বিশ্বাস করাতে পারল না। মা তো রাগ করে রাজীবের সাথে কথাবলা বন্ধ করল। বাবা নিজের কাজ নিয়ে বসল। মামা পর্যন্ত গেস্ট রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ল।
রাজীবের ভীষণ মন খারাপ হলো। পরদিন সকালে রাজীব গাছকে সব বলল। আমগাছ বলল, ‘রাজীব, কাকের বাসাটা একটু ভালো করে দেখো তো। প্রায়ই তোমার ঘরে ঢুকে খাবার নিয়ে আসে। ওদের যা স্বভাব, হয়তো ঘড়িটাও নিয়ে এসেছে।’
কাকের ঘড়ি নিয়ে যাওয়ার কথা বিশ্বাস হচ্ছিল না রাজীবের। তবু ভাবল একবার দেখাই যাক। ঝুল ঝাড়াটা নিয়ে এসে কাকের বাসায় খোঁচা দিয়ে দেখতে গেল যেই, ওমা! কোত্থেকে কাক দুটো এসে কা কা করে চারদিক কাঁপিয়ে তুলল। একটা কাক রাজীবের দিকে ছুটে এল ঠোকর দিতে। ভয়ে রাজীব চেঁচিয়ে উঠলে মা ছুটে আসলো। সবকিছু দেখে মা ভারি বিরক্তভাবে বলল, ‘রাজীব, কেন তুমি কাকের বাসা ভাঙছো?’
রাজীব ভয়ে ভয়ে বলল, ‘ওখানে মামার ঘড়ি আছে।’
মা ধরে নিলো ঘড়িটা রাজীব ওখানে ছুড়ে দিয়েছে। মা বাবাকে ডেকে আনল। সত্যি সত্যি ঘড়িটা কাকের বাসায় পাওয়া গেল। মা রাজীবের কান মলে দিয়ে বলল, ‘আর যদি কোনোদিন এমন করো তবে কঠিন শাস্তি পাবে, মনে রেখো।’
রাজীব ঠিক করল ও কারো সঙ্গে কথা বলবে না। মামা ওকে বিশ্বাস করেনি, এমন মামার কাছে কি কেউ যায়? মা-ও তাকে কান মলে দিয়েছে। আর বাবা ঘুমাতে যাওয়ার আগে শুভরাত্রি বলেনি। রাজিব আমগাছকে বলল, ‘দেখলে আমার কথা কেউ বিশ্বাসই করল না, ওদের সঙ্গে আমি আড়ি দিয়েছি, কারো সঙ্গে কথা বলব না।’
আমগাছ বলল, ‘ছোটদের কথা বড়োরা অনেকসময়ই বিশ্বাস করে না। তুমি মন খারাপ কোরো না।’
ওদিকে খাবার টেবিলে তখন মা-মামা বলাবলি করছিল, ঘড়িটা কাক নিয়ে গিয়েও থাকতে পারে। কিছুদিন ধরে কাকদুটো জানালা খোলা পেলেই ঘরে ঢুকে এটা সেটা নিয়ে যাচ্ছে। কাকের বাসায় সেরকম কিছু জিনিস পাওয়াও গেছে।
মামা বলল, পুঁচকুটার সাথে বেশি রাগ করা হয়ে গেছে। যাই, রাগ ভাঙিয়ে আসি।
মামা আজই চলে যাবে। কাপড় গুছাচ্ছিল। রাজিব বলল, ঘড়িটা কাক নিয়েছে সেই কথাটা আমি কী করে জানলাম বলোতো?
—কী করে জানলে মামু?
—আমগাছ বলেছিল।
রাজিবের কথা শুনে মামা হা হা করে একচোট হেসে নিয়ে বলল, ‘মামু, তোর গল্প তো রূপকথার মতো শোনাচ্ছে!’
রাজীব বিরক্ত হয়ে সরে আসলো। বড়োদের এই এক দোষ—ছোটদের কথা কিছুতেই বিশ্বাস করে না।
অলঙ্করণ
তাশকিনা হোসেন চিশ্তী
সপ্তম শ্রেণি, বাচা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, ঢাকা
