১৯৭৪-এ যখন দেশে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, তখনকার চেয়ে জনসংখ্যা বেড়েছে আড়াই গুণ। ৪৬ বছরে আবাদি জমি কমেছে অনেকখানিই, কিন্তু চুয়াত্তরের মতো অবস্থায় আমাদের আর পড়তে হয়নি। এই সাফল্যের বড় ভাগীদার আমাদের কৃষক।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় ১৯৬১ সালে। প্রথম দিকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা ছিল এসএসসি পাশ। ১৯৬৭ সাল থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক বেরোতে শুরু করে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সেই সঙ্গে কৃষি গবেষণা কেন্দ্রসমূহের গবেষণার ফসলই হচ্ছে কৃষকদের সাফল্যের চাবিকাঠি।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বেরিয়ে আসা স্নাতকেরা নিয়োজিত হয়েছেন গবেষণবাকাজে। ফলে ধান, গম, আলু, ডালসহ নানান কৃষিপণ্যে উন্নত ফলনশীল বীজ উদ্ভাবন সম্ভব হয়েছে।
দেশে জনসংখ্যা বাড়বেই, তা যত কম হারেই হোক আর কৃষিজমির পরিমাণও কমবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও আবাসন গৃহনির্মাণের কারণে। মানুষের খাদ্যচাহিদা মেটানো একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এবং যে কোনো মূল্যে এটা মেটাতেই হবে।
কৃষি খাতে লোকবলও কমছে। তরুণ যুবকরা খুব কমই আসছে প্রচলিত কৃষিকাজে। কৃষকপুত্র বিদেশের শ্রমবাজারে যাচ্ছেন। তারা ফিরে এলেও পৈতৃক পেশায় ফিরছেন না। ফলে আমাদের ভবিষ্যত্ কৃষিকাজ সনাতনী ধারা থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক পদ্ধতিতেই করতে হবে। ৫০ বছর আগের কৃষক নেংটি পরে জমিতে কাজ করতেন। আজ তন্নতন্ন করে খুঁজলেও নেংটি পরা কৃষক পাওয়া যাবে না। তেমনি আগামী ৫০ বছর, ৫০ নয় তারও আগেই দেখা যাবে ফর্মাল পোশাক পরা কৃষক কৃষিকাজ করছেন।
ফর্মাল পোশাক পরা কৃষকের জন্য চাই কৃষির আধুনিকায়ন। সেজন্য দরকার প্রযুক্তি ও গবেষণা। ধার করা প্রযুক্তি নয়, আমাদের নিজেদের জন্য লাগসই প্রযুক্তি। আর কৃষি মানে এখন শুধু কৃষিপণ্য উত্পাদন নয়, কৃষি পণ্য সংরক্ষণও আজকের কৃষির গুরুত্বপূর্ণ দিক।
ময়মনসিংহে যদি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত না হতো সেই ষাট বছর আগে, তাহলে আমরা কৃষির বর্তমান অবস্থানে আসতে পারতাম না। আজ যদি আমরা কৃষিপ্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করি, তাহলে আবারও ৫০-৬০ বছর পরে মানুষ উন্নততর জীবনযাত্রায় থেকে কৃষিকাজ করবে।
কোথায় হতে পারে কৃষিপ্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়? কোথায় পাওয়া যাবে গবেষণার পর্যাপ্ত পরিবেশ? পাকিস্তান আমল থেকেই ঈশ্বরদীতে গড়ে উঠেছে ডজনখানেক কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ঈশ্বরদী শহরের এক-তৃতীয়াংশের বেশি জমিই এসব গবেষণা প্রতিষ্ঠানের। এসব গবেষণা প্রতিষ্ঠানে যতসংখ্যক পিএইচডি ডিগ্রিধারী বিজ্ঞানী আছেন, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েও তত নেই।
শুধু বিজ্ঞানীগণ নন ঈশ্বরদীতে কয়েক ডজন কৃষক আছেন, যারা নতুন নতুন কৃষিপণ্য ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ভূমিকা রেখেছেন। যোগাযোগব্যবস্থায় ঈশ্বরদীর সমমানের সমৃদ্ধি খুব কম জায়গাতেই আছে। বিমান, রেল, সড়ক ও নদী—সব পথেই রয়েছে যোগাযোগ নেটওয়ার্ক। গবেষণার জন্য ঈশ্বরদীর মাটি উত্কৃষ্ট বলেই এখানে এত গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
সব দিক বিবেচনায় তাই ঈশ্বরদীই কৃষিপ্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উপযুক্ত স্থান। নানাবিধ স্থাপনা থাকায় এটি সাশ্রয়ী হবে। স্বাধীনতার শতবর্ষের মানুষ উন্নত কৃষিব্যবস্থায় প্রবেশ করবে এই প্রত্যাশায় ঈশ্বরদীতে স্থাপিত হোক বাংলাদেশ কৃষিপ্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হবে কৃষি পণ্য ও প্রযুক্তিতে উচ্চতর গবেষণা। গোটা রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে কিন্তু একটাও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নেই, যা আর সব বিভাগেই আছে।
n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব
