শুঁটকি তৈরির ধুম পড়েছে উখিয়া-টেকনাফে

আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০২০, ০০:১৮

 ‘ছুরি হুঁনির তরকারি, বেশি অইয়ে ঝাল/ কী ছালন রাইন্ধে বউয়ে/ পুড়ি যারগই গাল’—শিল্পী শেফালী ঘোষ ও শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের গাওয়া এ গানেই লুকিয়ে আছে কক্সবাজার তথা চট্টগ্রামে উত্পাদিত শুঁটকির আদ্যোপান্ত। এখানকার ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে এই সুস্বাদু শুঁটকি। প্রতি বছর শীত এলে এ অঞ্চলের মানুষের প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় স্থান করে নেয় নানা ধরনের শুঁটকির তরকারি। শীত আসার আগে এই সময়ে শুঁটকি তৈরি ও শুকানোর ধুম পড়েছে উপকূলবর্তী এলাকাগুলোতে। শুঁটকি বিক্রির মাধ্যমে স্বাবলম্বী হচ্ছে হাজারেরও অধিক পরিবার। শুঁটকি ব্যবসায়ীদের অভিমত, মৌসুমে উপকূলীয় এলাকায় কয়েক কোটি টাকার শুঁটকি বিক্রি হয়ে থাকে।

বঙ্গোপসাগরের পাশেই এ সরকারের নির্মিত নান্দনিক মেরিন ড্রাইভের পশ্চিমে কৃষি জমিতে ছোট ছোট কাঁচা ঘর করে বসবাস করছে বেশ কিছু পরিবার। তাদের বাঁশের চাঙ্গা ও লম্বালম্বি বাঁশের ফ্রেম করে শুঁটকি তৈরি করতে দেখা গেছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূলত এরা সাগর উকূলে শুঁটকি উত্পাদন ও বাজারজাত করে জীবন যাপন করে থাকে, যে কারণে অনেকেই এটাকে শুঁটকিপাল্ল হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

পানিভর্তি ড্রামের মধ্যে লবণ মিশিয়ে তারা এগুলো গুলিয়ে নেয়। তারপর বিভিন্ন ফিশিংবোট থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ঐ লবণপানিতে বেশ কয়েকবার চুবিয়ে চাটাইতে শুকানোর জন্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলে রাখে।

কথা হয় আছিয়া খাতুন (৫৫) নামের এক নারীর সঙ্গে।          তিনি জানান, তার স্বামী মহিবুল্লাহর ফিশিং বোটের মাঝি হিসেবে দীর্ঘদিন যাবত্ সমুদ্রে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। তিনি সমুদ্র থেকে তীরে নোঙর করার পর উন্নত জাতের মাছ ফিশিং বোটের মালিকপক্ষ বিক্রি করে তাদের প্রাপ্য মজুরি দিয়ে দেন। ঐ মজুরির টাকা দিয়ে তিনি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ক্রয় করে বাড়িতে নিয়ে এসে রোদে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করেন। তিনি জানান, এখন চলছে শুঁটকি শুকানোর মৌসুম। আর কয়েক দিন পর ব্যবসায়ীরা এখানে এসে পাইকারি দরে এসব শুঁটকি কিনে নিয়ে যাবেন।

পাশেই আরেকটি বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাঁশ দিয়ে লম্বা করে মাচাং বানানো হয়েছে। সেই মাচাংয়ে খুব সুন্দর পরিপাটি করে শুকানো হচ্ছে ছুরি মাছ। জানতে চাইলে ইমাম হোছেন জানান, তিনি আগে সাগরে মাছ ধরতেন। একদিন নৌকাডুবিতে তার নৌকার পাঁচ মাঝিমাল্লা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তিনি গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান না। মাছ শুকিয়ে তা বিক্রি করে জীবন ধারণ করে থাকেন।

উপকূলীয় মত্স্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি নাজির হোছেন মাঝি জানান, উপকূলীয় এলাকায় বসবাসরত পরিবারের মধ্যে বেশির ভাগ দিনে এনে দিনে খায়। তারা ছেলেমেয়ে নিয়ে সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ সংগ্রহ করে রোদে শুকিয়ে শুঁটকি বিক্রি করে জীবন ধারণ করে। তাছাড়া এখানকার উত্পাদিত শুঁটকি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। সরকারিভাবে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণে উদ্যোগ নেওয়া হলে এখানকার শুঁটকি রপ্তানির মাধ্যমে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব ছিল।

উপজেলা মত্স্য কর্মকর্তা সুরজিত্ পারিয়াল বলেন, দেশের বৃহত্তম চরাঞ্চল হিসেবে খ্যাত উখিয়া টেকনাফের উপকূলীয় এলাকায় কাঁচা মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে তৈরি করা শুঁটকির কদর সারা দেশে রয়েছে। তাই এসব শুঁটকি উত্পাদনে জেলেদের উত্সাহিত করা হবে। শুঁটকি উত্পাদন করে যেন স্বাবলম্বী হতে পারে, সে ব্যাপারে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।