অন্যান্য দিনের মতো স্বাভাবিক ছিল রাজধানীর রাজপথ। লোকজন যে যার মতো চলাচল করছে, যানবাহন যাচ্ছে-আসছে। কোথাও কোনো ছন্দপতন নেই। কিন্তু এর মধ্যে হঠাত্ করে রাজধানীর কয়েকটি স্থানে বাসে জ্বলে উঠল আগুন। যাত্রীরা ভয়ে-আতঙ্কে দ্রুত বাস থেকে নেমে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করে। এতে পুড়ল সরকারি-বেসরকারি ৯টি বাস। তবে এসব ঘটনায় হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) মনে করছে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও সহিংসতার উদ্দেশ্যেই বাসে আগুন দেওয়া হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে শুরু হয়ে বিকাল সাড়ে ৫টার মধ্যে চলে এই আগুন-সন্ত্রাস। রাজধানীর প্রেসক্লাব, গুলিস্তান, মতিঝিল, নয়াবাজার, কাঁটাবন মোড়, নয়াপল্টন, পল্টন থানাধীন এলাকা ও ভাটারার কোকাকোলা মোড় এলাকায় এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের প্রচেষ্টায় এসব বাসের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। কাঁটাবন এলাকায় আগুন দেওয়া বাসটি পুরোপুরি পুড়ে গেছে। অন্যগুলো পুড়েছে আংশিক। এসব ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে পল্টন, বংশাল ও শাহবাগ থানায় তিনটি মামলা দায়ের হয়েছে। মামলায় আসামির নাম জানা যায়নি।
পুলিশ ও পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বছর ছয়-সাত আগে রাজধানী ও সারা দেশে যেভাবে পরিবহনে আগুন দেওয়া হয়েছিল, এবারও একই কায়দায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। যাত্রীবেশে বাসে উঠে দুর্বৃত্তরা বাসের পেছনে আগুন ধরিয়ে দিয়ে দ্রুত সটকে পড়ে। এর পরপরই রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। দুপুরের পর থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মোতায়েন করা হয় কয়েক প্লাটুন পুলিশ ও জলকামান। আশপাশের সড়ক ও গলিতেও রয়েছে পুলিশের সতর্ক অবস্থান। অন্যদিকে বাসে আগুন দেওয়ার পরপরই পুলিশ নয়াপল্টনে বিএনপির অফিসের সামনে থেকে ৯ জন নেতাকর্মীকে আটক করেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার জামিল হাসান। তবে তিনি বলেন, বিএনপি অফিসের সামনে থেকে নয়, বাস পোড়ানোর অভিযোগে তাদের আশপাশের এলাকা থেকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া বংশাল এলাকা থেকে দুই জন ও পুলিশ গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগে উত্তরা থেকে এক জনকে আটক করেছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির উপ-কমিশনার (মিডিয়া) ওয়ালিদ হোসেন। বিএনপির কার্যালয়ের সামনে পুলিশের সতর্ক অবস্থানের ব্যাপারে এক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘রাজধানীর কয়েকটি জায়গায় প্রায় একযোগে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, তাই সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিতে আমরা এখানে অবস্থান নিয়েছি।’ এদিকে ডিএমপির উপ-কমিশনার (মিডিয়া) ওয়ালিদ হোসেন জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের ধরন দেখে ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো পূর্বপরিকল্পিত। নিঃসন্দেহে সহিংসতার উদ্দেশ্যেই পার্কিং করা সরকারি যানবাহনে এবং রাস্তায় চলমান গণপরিবহনে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন স্থানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যেদের সহযোগিতায় দুর্বৃত্তদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। পুলিশ জানিয়েছে, গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় সিসি ক্যামেরা থেকে ভিডিও ফুটেজ শনাক্ত করা হয়েছে। ঢাকা-১৮ আসনে উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে একযোগে বাসে আগুন দেওয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, বিগত ২০১৪ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে-পরে যেভাবে বাসে আগুন দিয়ে নাশকতা সৃষ্টি করা হয়েছিল, ঠিক সেই স্টাইলেই রাজধানীতে বাসে আগুন দেওয়া হয়েছে। বাসে আগুন দেওয়ার জন্য দুর্বৃত্তরা গানপাউডার ব্যবহার করেছে।
ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের ডিউটি অফিসার রাসেল শিকদার জানিয়েছেন, আমরা অগ্নিকাণ্ডের প্রথম সংবাদ পাই ১২টা ৩৫ মিনিটে, সর্বশেষ খবর পাই বিকাল সাড়ে ৫টায় ভাটারা এলাকায়। তিনি বলেন, ‘৯টি বাসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তবে সবগুলোই নির্বাপণ করা হয়েছে। কোনো হতাহতের সংবাদ আমরা পাইনি।’ কাঁটাবনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, দুপুর দেড়টার দিকে বাসটি যানজটের কারণে গতি কমাচ্ছিল। তখনই বাসটির পেছন দিক থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। তবে বাসে থাকা যাত্রীরা দ্রুত নেমে পড়ে।
পল্টন থানার (ওসি) আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, গুলিস্তানে রমনা ভবনের সামনে পল্টন থেকে সদরঘাটগামী ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনরে বাসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। বাসটি যাত্রীবোঝাই ছিল। যাত্রীরা দ্রুত নেমে যায়। বিএনপি অফিসের বিপরীতে আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখা আয়কর বিভাগের একটি স্টাফ বাসে আগুন দেওয়া হয়েছে। পল্টন থানার ওসি আরো বলেন, ‘গোলাপ শাহর মাজার এলাকায় ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের একটি মিছিল ঐ এলাকা অতিক্রম করার পরই বাসে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে বলে জেনেছি। ঐ মিছিল থেকে ‘আগুন জ্বালাও’, ‘জ্বালাও পোড়াও’ স্লোগানও দেওয়া হয়েছে। তবে প্রকৃতপক্ষে বাসে আগুন কে বা কারা দিয়েছে, সেটি এখনো জানা যায়নি। আমরা তদন্ত করছি।’ শাহবাগ থানার ওসি মোহাম্মদ মামুন অর রশিদ বলেন, আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে ও প্রেসক্লাব এলাকায় অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা দুটি বাসে আগুন দিয়েছে। তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। জাতীয় প্রেসক্লাব এলাকার বেশ কয়েক জন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, ছাত্রদলের একটি মিছিল প্রেসক্লাব অতিক্রম করছিল। মিছিল থেকে উপনির্বাচনে ভোট কারচুপির প্রতিবাদ জানিয়ে স্লোগান দেওয়া হয়। ঐ মিছিল প্রেসক্লাব এলাকা অতিক্রম করার পরপরই সচিবালয়ের পেছনের রাস্তায় একটি বাসে আগুন জ্বলতে দেখা যায়।
সতর্ক পুলিশ, রাজধানীতে তল্লাশি
বাসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরপরই রাজধানীর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ মোড়, প্রধান সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। এসব চেকপোস্টে থানার পুলিশের সঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। চেকপোস্টে মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন থামিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সন্দেহভাজনদেরও তল্লাশি করা হচ্ছে। পাড়া-মহল্লায় বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা তত্পরতা। এছাড়া চলাচলকারী যানসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, হোটেল, মন্দির, গির্জায় বিশেষ অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পাশাপাশি গোয়েন্দারা এসব স্থানে নজরদারি বাড়িয়েছে।
