অবশেষে অনেক বড় সুখবর আসিয়াছে করোনা ভাইরাসের টিকা লইয়া। গত সোমবার মার্কিন ঔষধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি ফাইজার জানাইয়াছে, তাহাদের প্রস্তুতকৃত ভ্যাকসিনটি ৯০ শতাংশের অধিক কার্যকর। স্বাভাবিকভাবেই ইহা দারুণ একটি উল্লসিত হইবার মতো সুখবর। তবে সুখবরটি বহুলাংশে পৌরাণিক রাজার অসুখ সারাইবার মতো। রাজার অসুখ করিয়াছে, কোনো ঔষধ কাজ করিতেছে না। অবশেষে ঔষধ পাওয়া গেল। একজন সুখী মানুষের জামা লাগিবে। সুখী মানুষও পাওয়া গেল, কিন্তু দেখা গেল তাহার জামা নাই! ফাইজারের ভ্যাকসিনটিও বহুলাংশে অনুরূপ। ভ্যাকসিন পাওয়া গেল, কিন্তু তাহাকে সংরক্ষণ করিবার মতো অবকাঠামো নাই বিশ্বের অধিকাংশ দেশে। কী সেই অবকাঠামো, তাহা স্পষ্ট করিয়াছে ফাইজার কর্তৃপক্ষ। এই টিকা সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন মেরু অঞ্চলের শীতলতম স্থান। হিমাঙ্কের নিচে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এই টিকা সংরক্ষণ না করিলে তাহা অকার্যকর হইয়া যাইবে। মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এই টিকা ছয় মাস পর্যন্ত ভালো থাকিবে। কিন্তু হাসপাতালে সাধারণভাবে ব্যবহূত রেফ্রিজারেটরে ইহা মাত্র পাঁচ দিন ভালো থাকিবে। অথচ এই টিকা ২৮ দিনের ব্যবধানে দুইটি ডোজ দেওয়ার নিয়ম। সুতরাং এই টিকার জন্য বিশ্বের যে কোনো দেশের কোনায় কোনায় বিপুলসংখ্যক বিশেষ ধরনের কোল্ডস্টোরেজ চেনের ব্যবস্থা থাকিতে হইবে। বিষয়টি কেবল খরচসাপেক্ষই নহে, সময়সাপেক্ষও বটে।
তাহা হইলে উপায়? সুখী মানুষ পাওয়া গেল বটে। জামা কি অধরা থাকিবে? রাজার অসুখ কি সারিবে না? ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানাইয়াছে, ফাইজার সুটকেস আকারের একটি বিশেষ ট্রান্সপোর্ট বক্স তৈরি করিয়াছে। ড্রাই আইস তথা জমাটবাঁধা কার্বন ডাইঅক্সাইড ভর্তি এই বাক্সে জিপিএস ট্র্যাকারও ইনস্টল করা থাকিবে, যাহা না খোলা অবধি ১০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাইবে ৫ হাজার ডোজের ভ্যাকসিন। আরো অনেক কোম্পানি অনুরূপ কোল্ডবাক্সের পরিকল্পনার কথা জানাইয়াছে। বিভিন্ন ধরনের রোগের জন্য বিশ্বে সবচাইতে বেশি ভ্যাকসিন উত্পাদনসক্ষমতা রহিয়াছে ভারতের। ভারতেও এই মুহূর্তে ফাইজার টিকা সংরক্ষণের জন্য মাইনাস ৭০ ডিগ্রির স্টোরেজ ব্যবস্থা নাই। হুয়ের আফ্রিকার রিজিওনাল ডিরেক্টরও মনে করিতেছেন—ফাইজার যেই ধরনের টিকা তৈরি করিয়াছে, তাহার চাহিদামতো কোল্ডস্টোরেজের ব্যবস্থা করাটাই আফ্রিকার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফের সঙ্গে হু একযোগে করোনা ভাইরাস ভ্যাকসিনের প্রত্যাশায় কোল্ডস্টোরেজ সুবিধার ম্যাপিংয়ের কাজ করিয়াছে। ইউনিসেফেরও লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে স্বল্প আয়ের দেশে ৬৫ হাজার সোলার চালিত কোল্ডস্টোরেজ স্থাপন করা। তবে আরেকটি বিষয় হইল, ফাইজার ভ্যাকসিন তৈরি হইয়াছে এমআরএনএ অর্থাত্ ভাইরাসের জেনেটিক কোড ব্যবহার করিয়া। ইহার গুণমান বজায় রাখিবার জন্য বিপুল আয়োজনের দরকার বিধায় ইহার প্রতিটি ডোজের দামও পূর্বনির্ধারিত আনুমানিক ৩ হাজার টাকার চাইতে কম হইবে না। অর্থাত্ গণহারে প্রয়োগের জন্য টিকাটি যথেষ্ট দামি। আমেরিকার ফাইজারের পাশাপাশি রাশিয়া দাবি করিয়াছে, তাহাদের স্পুটনিক টিকা ৯২ শতাংশ ক্ষেত্রে কার্যকর। এফডিএ ইতিপূর্বে বলিয়াছে, করোনা টিকার কার্যক্ষমতা ৫০-৬০ শতাংশ হইলেই ছাড়পত্র দেওয়া হইবে। সেই নিরিখে দুইটি টিকাই আশার সঞ্চার করিয়াছে।
এই মুহূর্তে করোনা মহামারি ঠেকাইতে টিকার চাইতে ভালো বিকল্প নাই। তবে টিকা লইয়াও বিশ্বব্যাপী রাজনীতি দেখা দিয়াছে। কিন্তু বাস্তবতা হইল, বিশ্বের কোথাও যদি একজনও কোভিড-বাহক থাকেন, তবে এই বিশ্ব কোভিডের ঝুঁকি হইতে মুক্ত হইবে না। সুতরাং বিশ্বের পরাশক্তিদের নিজেদের স্বার্থেই কোভিডের ভ্যাকসিন সহজলভ্য করা প্রয়োজন। নচেত্ প্রজাদের ভিতরেই সুপ্ত থাকিবে রাজাদের বিপদের বীজ।
