গৌরব জি. পাথাং
যীশু খ্রীষ্ট ক্ষমা ও ভালোবাসার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। শত্রুদের দ্বারা ক্রুশবিদ্ধ হয়েও তাদের ক্ষমা করেছেন। যীশুর শিষ্য পিতর যীশুকে গ্রেপ্তার করতে আসা একজনের ডান কান কেটে ফেলেছিল। তখন যীশু বলেছিলেন, ‘তোমার তলোয়ারটা যেখানে থাকার কথা, আবার সেখানেই রেখে দাও। যারা তলোয়ার ধরবে, তারা সবাই তলোয়ারের আঘাতেই মরবে’ (মথি ২৬:৫২)। যীশু বলেছেন, ‘তোমরা শুনেছ যে, এই কথা বলা হয়েছিল: চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত। কিন্তু আমি তোমাদের বলছি: ঐভাবে দুর্জনকে প্রতিরোধ করতে যেয়ো না। বরং কেউ তোমার ডান গালে চড় মারলে মুখ ঘুরিয়ে অন্য গালটিও তার দিকে পেতে দাও’ (মথি ৫:৩৮)।
ক্ষমা শব্দটি কেবল ধর্মগ্রন্থে কিংবা নৈতিক-মূল্যবোধ বিষয়ক শিক্ষা-বইয়ের পাতায় রয়ে গেছে। ক্ষমার পরিবর্তে তাই প্রতিশোধমূলক নানা আন্দোলন দেখি। অনেকেরই মতামত ও সম্মতি রয়েছে যে ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা’। এটা সত্যি যে আমাদের দেশে বিচারহীনতায় অপরাধীরা বারবার অপরাধ করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। তাদের শাস্তি হয় না, বরং অনেককেই পুরস্কার দেওয়া হয়। বড় বড় আসনে বসানো হয়, নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। আমাদের দেশ এমন এক দেশ যেখানে অপরাধীদের বিচারের জন্য মিছিল করতে হয়, আন্দোলন করতে হয়। নইলে অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয় না, বিচারে দাঁড়াতে হয় না, সমাজে ও পরিবারে কোনোরকম নিন্দা-অবজ্ঞা শুনতে হয় না। বিচার চেয়ে পায় না, ন্যায্যবিচার হয় না। কখনোবা বিচার হয় কিন্তু শাস্তি হয় না। শাস্তি হয় কিন্তু সংশোধন হয় না, পরিবর্তন হয় না। যেজন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন: ‘আমি যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে/বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’।
নেতিবাচক খবরের মধ্যেও মাঝে মাঝে দুয়েকটা ভালো খবর দেখতে পাই। গত ১৪ অক্টোবর ২০২০-এ চ্যানেল ২৪ নিউজে দেখলাম এক ব্যতিক্রমী বিচার। সুনামগঞ্জের শিশু আদালতের বিচারক ১৪ জন শিশুকে সংশোধনাগারে না পাঠিয়ে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছেন। তবে ৭টি শর্ত তাদেরকে মানতে হবে। বাবা-মায়ের সেবা করা, বাবা-মায়ের আদেশ পালন করা, মানতে হবে ধর্মীয় অনুশাসন, নিয়মিত পাঠ করতে হবে ধর্মগ্রন্থ, ২০টি গাছ রোপণ ও পরিচর্যা করতে হবে, অসত্ সঙ্গ ত্যাগ করতে এবং মাদক সেবন থেকে দূরে থাকতে হবে। বিচারকের রায়ে অনেকেই খুশি হয়েছেন, অনেকেই ইতিবাচক বলে মনে করছেন। কারণ এতে শিশুরা নিজেদের ভুল বুঝতে পারবে, পরিবারের ভালোবাসা উপলব্ধি করতে পারবে—যা শিশুদের মধ্যে পরিবর্তন এনে দেবে।
বর্তমান সময়ে নারী নির্যাতন, অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণ, কটূক্তি, ইভটিজিং বাড়ছে। গত ১৫ অক্টোবর একটি পথনাটক দেখলাম। সেখানে এক নারী বলছে, ‘আমি পাবলিক স্পেসের ভেতর দিয়ে হাঁটি বলে আমি কোনো পাবলিক স্পেস না। আমার শরীর কোনো পাবলিক স্পেস না। আমার শরীর আমার। আমার সিদ্ধান্ত আমার।...এই শরীর নিয়ে আমার কোনো অস্বস্তি নেই। আমার স্বস্তি আছে। কারণ পৃথিবীতে একমাত্র আমিই যে শরীরের ভেতর আরেকটা শরীর বড় করতে পারি। আমার স্বস্তি আছে। কারণ পৃথিবীতে একমাত্র আমিই যে আরেকটা মানুষের জন্ম দিতে পারি...।’ ভারত উপমহাদেশের সংগীতজ্ঞ ভুপেন হাজারিকা সমাজ ও রাষ্ট্রের অমানবিক আচরণ দেখে মা গঙ্গাকে উদ্দেশ্য করে গান গেয়েছেন, ‘নৈতিকতার স্খলন দেখেও, মানবতার পতন দেখেও নির্লজ্জ অলসভাবে বইছ কেন?/জ্ঞানবিহীন নিরক্ষরের, খাদ্যবিহীন নাগরিকের, নেতৃবিহীনতায় মৌন কেন?/ ব্যক্তি যদি ব্যক্তিকেন্দ্রিক, সমষ্টি যদি ব্যক্তিত্বরহিত তবে শািথল সমাজকে ভাঙ না কেন?’ শিথিল সমাজকে ভেঙে গড়তে হবে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক, দলীয়করণ, স্বার্থপরতা, স্বজনপ্রীতির বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। বিদ্বেষ ছড়ানো পরিহার করতে হবে। বদলা নয়, বদল চাই।
ঢাকা
