এমপিওভুক্ত শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া জরুরি

আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০২০, ২১:৪০

নীলকণ্ঠ আইচ মজুমদার

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একেক ধাপে একেক রকম সমস্যা বিদ্যমান। যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারায় গ্রাম এবং শহরের শিক্ষায় ব্যাপক ফারাক তৈরি হচ্ছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বেকারত্বের বোঝা বাড়ছে। প্রাথমিক ধাপে যেমন বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে, তেমনি রয়েছে মাধ্যমিক পর্যায়েও। সরকার প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার মান বৃদ্ধি এবং ছাত্রছাত্রীদের স্কুলে আনার জন্য যে কর্মসূচি নিয়েছে, তাতে ভালো ফল মিলেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে শতভাগ বৃত্তি, খাবারের ব্যবস্থা, ড্রেসের জন্য অর্থ প্রদান, একাডেমিক ভবন নির্মাণ, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, সর্বোপরি ২৬ হাজার রেজিস্ট্রার্ড বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ—এক কথায় বলা যায় সরকার এক্ষেত্রে সফলতার পরিচয় দিয়েছে। এখন এ সফলতাকে ধরে রেখে যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শিক্ষার মানের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আর এ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে স্কুল পর্যায়ের যাবতীয় কাজ মনিটরিং। আর সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

শুধু সরকারি করেই শিক্ষার সুফল পাওয়া যাবে না। এতে হয়তো শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত হবে এবং ভালো সার্টিফিকেটধারী শিক্ষার্থীরা শিক্ষক হিসেবে আসবে; কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থার সংশোধন না হলে মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে জাতি। প্রতি উপজেলায় একটি কলেজ ও স্কুল সরকারিকরণের ফলে জেলা-উপজেলার সঙ্গে গ্রামের আরো বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত হচ্ছে মাধ্যমিক স্তরে। যে স্তরের ৯৬ ভাগই এমপিওভুক্ত। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত ব্যবস্থাপনা এবং পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার মান। এমনও দেখা গেছে স্কুল স্থাপন করে নিজেরাই নিয়োগ নিয়েছেন। নিবন্ধন প্রক্রিয়ার পরও চলেছে টাকার খেলায় জয়ী হয়ে শিক্ষক হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করা। প্রবেশ করার ধরনটা সঠিক না হলেও পরবর্তী সময়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আগের সক্ষমতাকে পরিবর্তন করার সুযোগও পাচ্ছেন না শিক্ষকরা। সামান্য যাও পাচ্ছেন সেটাও ঠিকভাবে প্রয়োগ সম্ভব হচ্ছে না। এসব কারণে অনেক এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের দ্বারস্থ হচ্ছে। এমনকি মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়ছে।

শিক্ষাব্যবস্থা এখন এত বেশি বাণিজ্যিক হয়েছে যে বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখি করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানের। গ্রামের অভিভাবকদের আর্থিক ক্ষমতা যেমন কম তেমনি শিক্ষায় বিনিয়োগের আগ্রহটাও শহরের মতো নয়, তাই প্রতিনিয়তই পিছিয়ে পড়ছে গ্রামের শিক্ষার্থীরা। এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্পন্ন শিক্ষকের চরম সংকট। এনটিআরসিএ-র মাধ্যমে শিক্ষক ক্যাটাগরিতে নিয়োগের পরও ভালো মানের শিক্ষার্থীরা এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসতে চায় না। এছাড়াও এলাকায় চাকরি, স্থানীয় প্রভাব-প্রতিপত্তি থাকায় অনেক শিক্ষকই প্রতিষ্ঠানের প্রতি মনোযোগী নন।

এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে নিচের ক্লাসে সেকশন অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ হলেও এসব শিক্ষার্থী যখন ওপরের ক্লাসে যায়, তাদের জন্য আর শিক্ষক নিয়োগ হয় না। যার ফলে ওপরের ক্লাসগুলোতে  ১০০-১৫০ শিক্ষার্থী নিয়ে ক্লাস করাতে হচ্ছে শিক্ষকদের। এত শিক্ষার্থী নিয়ে একসঙ্গে ক্লাস করালে শিক্ষার মান বজায় রাখা আদৌ সম্ভব নয়। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রটা এনটিআরসিএ-র হাতে থাকলেও যাঁর দ্বারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হবে, সেই প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগের ক্ষেত্রটা এখনো যথাযথ প্রক্রিয়ায় আসেনি। ফলে নিয়োগ পাচ্ছেন না যোগ্যরা। যদিও ক্ষেত্রবিশেষে ব্যতিক্রম হতে পারে তবে সার্বিক চিত্রটা ভয়াবহ।

সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিশৃঙ্খলা দূর করা সম্ভব নয়। ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যবস্থাপনা আধুনিক না হলে বিশ্বমানের শিক্ষা অর্জন করা সম্ভব নয়।

ময়মনসিংহ