চায়ের কাপে জমে না আড্ডা

আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০২০, ২১:৪৯

পেশা পরির্বতন করেছেন অনেকে, কমেছে বিক্রি ৪০ শতাংশ

রাবেয়া বেবী

করোনা পরিস্থির কারণে জমে উঠেনি চায়ের দোকানগুলো। রাজধানীর বেশ কিছু এলাকা ঘুরে তেমন চিত্রই দেখা গেছে। চা-দোকানিরা জানান, তাদের বিক্রি আর আগের মতো নেই। ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতারা জানান, থার্মোফ্লাক্স নিয়ে হাঁটাহাঁটি করলে কদাচিত্ মেলে ক্রেতা। তাই ভ্রাম্যমাণ চা-বিক্রেতাও কমে গেছে। কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিনোদনকেন্দ্রগুলো বন্ধ, আগের মতো লোক সমাগম নেই। আবার স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য লোকজন দোকান ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের কাছ থেকে চা কম খাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৩০ শতাংশ কমেছে চা বিক্রি।

মো. রফিক ঢাকার বংশাল কায়েত্টুলিতে দীর্ঘদিন ধরে চা বিক্রি করছেন। দোকান দিয়ে সংসার চালিয়ে ছেলেমেয়ের পড়াশুনা অল্প হলেও করিয়েছেন। এক ভাইকে বঙ্গবাজার এলাকায় এই কাজ করার ব্যবস্থা করে দেন। আজ সে গ্রামের বাড়ি চলে গেছে। করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে কমতে শুরু করে চায়ের ক্রেতা। কারণ হিসেবে জানান, অভাবের কারণে গ্রামে চলে গেছে অনেক পরিবার। আবার আয়ও কমেছে অনেকের। তাই বাইরে চা খাওয়ার মতো বাড়তি খরচ তারা কমিয়ে আনছেন। আগামসি লেনের চা-বিক্রেতা মো. আল-আমিন জানান, পুঁজি নেই। বিক্রি কম বলে সংসারের খরচ মিটে না। তাই অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন অনেকেই। এই এলাকার অনেক জুতার কারখানা এখনো বন্ধ। তাই শ্রমিকরা চলে গেছেন গ্রামের বাড়ি। মানুষের হাতে টাকা কম বলে আগের মতো আড্ডা দিয়ে চা খায় না। আগে দিনে বিক্রি হতো ৫০০ কাপ। এখন তা নেমে গেছে ২৫০ কাপে। আসাদ গেটের বিক্রেতা সাজ্জাদ বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। ছাত্র, অভিভাবক ও তাদের গাড়ির চালকেরা চা খাচ্ছেন না। বলেন, দুধ চা বিক্রি হয় না। রং চা কিছুটা বিক্রি হয়। আগে সপ্তাহে ৫ হাজার টাকা বিক্রি হতো, এখন ১,৫০০ টাকা হয়।’ সেগুনবাগিচা এলাকার বিক্রেতা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠান বন্ধ বলে মানুষের সমাগম হয় না। তাই চায়ের চাহিদাও কম।’ মিরপুর এলাকার বিক্রেতা স্বপন মনে করেন, বিক্রি ২০ শতাংশ কমেছে।

এছাড়াও মতিঝিলের কয়েকজন চা-বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগের চেয়ে বর্তমানে বিক্রেতার সংখ্যা কম। কারণ, আগে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা একঘেয়েমি কাটানোর জন্য দিনে ২/৩ বার বাইরে এসে চা খেতে খেতে গল্প করতেন। এখন করোনার ভয়ে তারা রাস্তার চায়ের দোকানে জড়ো হচ্ছেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে জনপ্রিয় কিছু চায়ের দোকানে বাহারি রকমের চা পাওয়া যায়। সেখানেও ক্রেতার দারুণ অভাব। টিএসসি কেন্দ্রিক ব্যসায়ীরা জানান, অনেকে ছোটবেলা থেকে এই ব্যবসা করছেন। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের সবার ব্যবসা।

চা-বিক্রতারা পুঁজির সংকটে পড়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন ইস্পাহানি টি লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার ওমর হান্নান। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, শহরের বেশির ভাগ চা-বিক্রেতা ভাসমান, লকডাউন শুরু হলে তারা গ্রামের বাড়ি গিয়ে পুঁজি ভেঙে সংসার চালিয়েছেন। এখন তারা ফিরেও আসতে পারছেন না। আবার নিরাপত্তার জন্য মানুষ বাইরে চা খাওয়াও কমিয়ে দিয়েছে। সব মিলিয়ে বাইরে চা বিক্রি ৩০ শতাংশ কমেছে। আমরা পর্যবেক্ষণে দেখেছি, চা-শিল্পে এর একটা বিশাল নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কারণ মোট চা-বিক্রির ৪০ শতাংশ রাস্তার চা-বিক্রেতাদের দখলে থাকে।

অভিনেতা জাহিদ হাসান চায়ের দোকানে চা খেয়ে আড্ডা দিতে পছন্দ করেন অনেক আগে থেকেই, কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে তার এখন আর বাইরে গিয়ে আড্ডা দেওয়া হয় না, চা খাওয়াতো পরের কথা। বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা সামিহা সুলতানা বেশ কয়েক বছর আগেই বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়েন। কিন্তু সময় সুযোগে ক্যাম্পাসের চায়ের সঙ্গে আড্ডা ছাড়তে পারেননি আজও। কিন্তু গত কয়েক মাসে তার সেই ভালোলাগা আর উপভোগ করা হয়নি। বলেন, ‘খুব মিস করি চায়ের কাপে আড্ডা।’ সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘ছেলেবেলায় খুব চায়ের কাপে আড্ডা হতো, এখন আর হয় না। শহরের মধ্যবিত্ত মানুষের মধ্যে যে চা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে করোনার কারণে। খেটে খাওয়া মানুষ আলু, পেঁয়াজ কিনে ভাত খেতে পারে না। চা খাবে কি করে। তবে সিএনজি ট্যাক্সিচালক নজরুল, রিকশাচালক জাকির জানান, বাড়িতে চা খাওয়ার ব্যবস্থা নেই বলে তারা এখনো রাস্তায় চা খান। ক্লান্তি কাটাতে আগে যেখানে ছয়-সাত কাপ চা খেতেন। এখন দুই-তিন কাপ খান।