রণদা প্রসাদ সাহার প্রতি বিনম্র্র শ্রদ্ধা

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০২০, ২১:৪১

হেনা সুলতানা

একটি বিশ্বাস ও ভালোবাসার নাম দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা। সেই বিশ্বাস ও ভালোবাসার ছায়ায় আশ্রয় আছে, আছে স্নেহের পরশ। দৃশ্যত তিনি আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তার প্রতিষ্ঠানগুলো জানান দেয় তিনি আছেন। কুমুদিনীতে এলে ঘুচে যায় মনের অনেক দীনতা, অনেক বৈকল্য, যাকে রণদা প্রসাদ বলেছেন আমার তীর্থস্থান। রণদা প্রসাদের ব্যক্তিত্ব, কৃতী ও কীর্তির পরিচয় বিষয়ে যত অনুসন্ধান করা যাবে, ততই তার সম্পর্কে আমাদের ধারণা নবায়িত হবে। রণদা প্রসাদ ছিলেন উচ্চতর মূল্যবোধের অধিকারী এক বিস্ময়কর রকম শক্তিমান মানুষ। বিস্ময়কর ছিল তার শ্রমশক্তি ও চিন্তাশক্তি। তিনি তার কীর্তির চেয়েও অনেক বড়। সাধারণ বাঙালি চরিত্রের ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে মুক্ত এক অনন্য মানুষ ছিলেন তিনি। পক্ষান্তরে বাঙালি চরিত্রের গুণগুলোয় সমৃদ্ধ ছিলেন অতিসাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠা মানুষটি।

রণদা প্রসাদের জীবন শুরু হয়েছিল জীবনযুদ্ধ দিয়ে। কিশোর বয়সে সেই যুদ্ধ ছিল অতিশয় নির্মম। সাফল্য পেয়েছিলেন, যে কোনো বিবেচনায় তা অসামান্য, প্রায় রূপকথার মতোই। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি ছেলে মায়ের অকালমৃত্যুর পর যাকে আশ্রয়হীন, ঠিকানাহীন করে তোলে। বাবার অবহেলা, সত্-মায়ের অবহেলা, আত্মীয়স্বজনের স্নেহহীন দৃষ্টি তাকে বোহেমিয়ান করে তোলে। লেখাপড়া হলো না। বাড়ি থেকে পালিয়ে সুদূর কলকাতায়। কষ্টসহিষ্ণুতা, সাহস ও কর্মনিষ্ঠাই ছিল পুঁজি। এই নিয়েই এগিয়েছেন।

জীবনযুদ্ধ থেকে পৃথিবীর প্রথম মহাযুদ্ধে। সেখানেও অকুতোভয় বীরের পরিচয় দিলেন। যুদ্ধ শেষে রেলওয়ে বিভাগের সামান্য চাকরি। সেই চাকরিও ছাড়তে হলো কোনো এক চক্রান্তে পড়ে। কিন্তু ছাড়ার দরুন সরকারের কাছ থেকে পেলেন কিছু ক্ষতিপূরণ। সেই সামান্য পুঁজি সম্বল করে শুরু করলেন ব্যবসা। প্রথমে বাড়ি বাড়ি, পরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে. এরপর জাহাজে কয়লা সরবরাহ করতে লাগলেন। এর পরের গল্প কেবলই সফল্যের। প্রতিটি পদক্ষেপে ঝুঁকি ছিল। ব্যর্থ হলে সেই গল্প ইতিহাস হতো না, আমরাও শুনতে চাইতাম না। পিছু না হটা এক অদম্য সৈনিক নিছক চরিত্রগুণে সফল হয়েছেন। সম্বলহীন পথকিশোরের এই অবাক করা সাফল্য কিংবদন্তির মতোই শোনায়।

নারায়ণগঞ্জে রণদা প্রসাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উপার্জনের। আর খরচ করেছেন মির্জাপুরে—সেবা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। তার জীবনের ছন্দ ছিল এই রকম। সেই ছন্দে কখনো বাধা পড়েনি। রণদা প্রসাদের শিক্ষা ও সেবামূলক দর্শনের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তি খুবই প্রণিধানযোগ্য। ‘কালান্তর’ গ্রন্থের ‘লোকহিত’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন :‘আমরা পরের উপকার করিব মনে করিলেই উপকার করিতে পারি না। উপকার করিবার অধিকার থাকা চাই। যে বড়ো সে ছোটোর অপকার অতি সহজেই করিতে পারে, কিন্তু ছোটোর উপকার করিতে হইলে কেবল বড়ো হইলে চলিবে না—ছোটো হইতে হইবে, ছোটোর সমান হইতে হইবে। মানুষ কোনো দিন কোনো যথার্থ হিতকে ভিক্ষারূপে গ্রহণ করিবে না, ঋণরূপেও না, কেবলমাত্র প্রাপ্য বলিয়াই গ্রহণ করিতে পারিবে।...কিন্তু আমরা লোকহিতের জন্য যখন মাতি, তখন অনেক স্থলে সেই মত্ততার মূলে একটি আত্মাভিমানের মদ থাকে।... এমন স্থলে উহাদেরও অহিত করি, নিজেদেরও হিত করি না। .... হিত করিবার একটিমাত্র ঈশ্বরদত্ত  অধিকার আছে, সেটি প্রীতি।’

রণদা প্রসাদ মানুষকে যা দিয়েছেন, তা ভিক্ষারূপে দেননি, ঋণ হিসেবেও দেননি, দিয়েছেন তাদের প্রাপ্য হিসেবে। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ এই মানবধর্মে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের লোকহিতের মন্ত্রটিতে নিজের মতো করে দীক্ষিত হয়েছিলেন, যেখানে তিনি বড় হয়েও ছোটোর সমান হয়েছেন। গ্রামের হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অধিকার অর্জন করেছেন। তাকে কাছ থেকে দেখা মানুষদের আলোচনা থেকে জানা যায়, ছোটর জীবনকে সামনে রেখেই তিনি অর্থ উপার্জন করেছেন। আবার সেই অর্থ যখন সর্বসাধারণের জন্য ১৯৪৮ সালে কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টে  দান করেছেন, তখন কোনো আত্মগরিমা তাকে স্পর্শ করেনি। এ জন্যই তিনি রণদা প্রসাদ সাহা হতে পেরেছেন। আর সারা জীবন মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন। আত্মপ্রচারে উত্সাহী ছিলেন না রণদা প্রসাদ। তিনি জানতেন কাজই তার আত্মপ্রকাশ ও আনন্দ। এখানেই তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনি বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আশা জাগিয়েছিলেন। সেই সব মানুষই তাকে ভালোবেসেছে। আজ যারা তাকে চোখে দেখিনি, তারাও ভালোবেসেছে তার জীবন ও আদর্শের গল্প শুনে, হয়েছে অনুপ্রাণিত।

দানবীর রণদা প্রসাদ ১৮৯৬ সালের ১৫ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে ৭ মে পুত্র ভবানী প্রসাদকে নিয়ে তিনি বীরের মতো মৃত্যুবরণ করেছিলেন। মৃত্যুতে তিনি শেষ হয়ে যাননি, রণদা প্রসাদের কর্মময় জীবন, নীতি ও আদর্শ, অপার মানবিকতা, তার সমাজচেতনা, দেশপ্রেম আমাদের অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে নিরন্তর। তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই। 

n লেখক :শিক্ষক, ভারতেশ্বরী হোমস,

মির্জাপুর, টাঙ্গাইল