শেরপুরে সিন্ডিকেটের কবজায় আলুবীজ

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০২০, ২২:২৩

বগুড়ার শেরপুরে সিন্ডিকেটের কবজায় চলে গেছে আলুবীজ। ফলে স্থানীয় বাজারে আলুবীজের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। ডিলার ও ব্যবসায়ীদের কাছে বারবার ধরনা দিয়েও বীজ মিলছে না। তাই কৃষকরা তাদের জমি তৈরি করেও বীজের অভাবে রোপণ করতে পারছেন না। চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত বীজ না পাওয়ায় তাদের মধ্যে হাহাকার শুরু হয়েছে। এ অবস্থায় আলু চাষ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন চাষিরা।

এদিকে, কৃষকদের জিম্মি করে অসাধু ব্যবসায়ী ও ডিলাররা ইচ্ছেমতো দামে আলুবীজ বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মিশন নিয়েছে। তাই নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি বস্তা বীজ আলু ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি নিয়ে বিক্রি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় কৃষি অফিস জানায়, চলতি মৌসুমে এই উপজেলায় ২ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি হেক্টর জমিতে বীজ লাগে দেড় মেট্রিক টন। সে অনুযায়ী এই উপজেলায় বীজের প্রয়োজন ৩ হাজার ৯৪ মেট্রিক টন। কিন্তু বরাদ্দ মিলেছে মাত্র ১ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। যা অর্ধেকের কম। আর এসব বীজ বিক্রির জন্য প্রায় ৪৫ জন ডিলার রয়েছে। এর মধ্যে ডিএডিসির ১৮ জন, বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের আট জন ও অন্যান্য কোম্পানির ১৯ জন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ডিলাররা উত্তোলন না করায় সরকারি বিএডিসির আলুবীজ এখনো বাজারে আসেনি। তাই ভালো ফলন               পাওয়ার আশায় বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক সিড অ্যান্ড এগ্রো এন্টারপ্রাইজের আলুবীজের দিকে কৃষক ঝুঁকে পড়েছেন। কিন্তু বাজারে এই কোম্পানিসহ অন্যান্য কোম্পানির বীজ পাওয়া যাচ্ছে না। সিন্ডিকেটের কবজায় চলে গেছে ঐসব কোম্পানির আলুবীজ। তাই ডিলার ও ব্যবসায়ীদের দোকানে দোকানে ঘুরেও বীজ পাচ্ছেন না চাষিরা। তবে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দিলেই মিলছে তাদের কাঙ্ক্ষিত আলুবীজ। ফলে আলু চাষের পরিবর্তে অন্য ফসল চাষের কথাও ভাবছেন তারা।

উপজেলার শাহবন্দেগী ইউনিয়নের আলুচাষি দুলাল হোসেন, শাহ আলম, ফারুক হোসেন, আব্দুস সাত্তারসহ একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করে বলেন, ব্র্যাকের ৪০ কেজি ওজনের বীজ আলুর বস্তা বি-গ্রেড ২ হাজার ৮০ টাকা ও এ-গ্রেড ২ হাজার ২০০ টাকা বিক্রি করার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকায়। অর্থাত্ প্রতি বস্তায় ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি। এর পরও চাহিদা অনুযায়ী মিলছে না আলুর বীজ। তারা আরো জানান, গেল মৌসুমে বাজারে ভালো দাম পেয়ে কৃষক এবার আলু চাষে ঝুঁকে পড়লেও বেশি দামে বীজ কেনার কারণে একরপ্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা বেশি খরচ পড়বে। উত্পাদন খরচও বেড়ে যাবে। তাই আগামীতে আলুর ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষক ক্ষতির মুখে পড়বেন বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেন তারা। বিএডিসিসহ বেসরকারি কোম্পানির বিভিন্ন ডিলাররা বীজ বিক্রির ওপর কমিশন পান। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তেমন কোনো মনিটরিং না থাকার সুযোগ নিয়ে মুনাফাখোর ঐ চক্রটি পরিকল্পিতভাবে বাজারে আলুবীজের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। জানতে চাইলে ব্র্যাকের ডিলার মো. রফিকুল ইসলাম বীজ সংকটের কথা জানিয়ে বলেন, চাহিদা অনুযায়ী এ উপজেলায় বীজের বরাদ্দ নেই। বরং বরাদ্দ আরো কমেছে। তাই এবার শেষ পর্যন্ত আলুবীজের সংকট থেকেই যাবে। এছাড়া বীজের দাম বাড়ার পেছনে সাবডিলারদের দায়ী করে বলেন, প্রত্যেক বীজ ডিলার আবার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সাবডিলার (বীজ বিক্রেতা) নিয়োগ দিয়েছেন। তারা আগাম টাকা ও বুকিং দিয়ে আলুবীজ নিচ্ছেন। মূলত তারাই কোম্পানির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা নিচ্ছেন বলে জানান। বিএডিসি ও ব্র্যাকের আরেক ডিলার ফিরোজ উদ্দীন মাস্টার বলেন, সবেমাত্র আলু লাগানো শুরু হয়েছে। সবাই এক সঙ্গে আলু লাগানোর কারণে আলুবীজের চাহিদা বেড়ে গেছে। কিন্তু সে তুলনায় সরবরাহ কম পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া যেসব কৃষক আগাম বুকিং দিয়েছেন তারাই আগে বীজ পাচ্ছেন। তাছাড়া বিগত বছরগুলোতে তাদের লোকসান গুনতে হয়েছে। তবে এবার একটু লাভের মুখ দেখতে পাচ্ছেন বলেও স্বীকার করেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. শারমিন আকতার বলেন, এখানে কোনো বীজের সংকট নেই। সময়মতো সব কৃষকই বীজ পাবেন। তাই বীজের কারণে আলু চাষ ব্যাহত হবে না। কারণ দুই-এক দিনের মধ্যে বিএডিসির বীজ বাজারে আসলে শিগিগরই সেই শঙ্কা কেটে যাবে।