জীবজন্তুর প্রতি নিষ্ঠুরতা

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:২২

মাত্র কয়েকদিন আগেই বিরল প্রজাতির একটি চিতাবাঘকে পিটাইয়া হত্যার সচিত্র প্রতিবেদন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হইয়াছে। গত বুধবার একটি সহযোগী দৈনিকে প্রকাশিত খবরটি আরও মর্মান্তিক। পালক ঢুকাইয়া জীবন্ত একটি শামুকখোল পাখির দুই চোখ ফুটা করিয়া দেওয়া হইয়াছে। মর্মস্পর্শী সেই ছবিও ছাপা হইয়াছে পত্রিকায়। তাকানো যায় না ছবিটির দিকে। প্রশ্ন হইল, কেন এই অমানবিক নিষ্ঠুরতা? ইহার উত্তরে ঘটনাস্থল সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুরবাজার এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা যে-তথ্য তুলিয়া ধরিয়াছেন তাহা আরও ভয়ঙ্কর। বাংলাদেশের বিপন্ন প্রজাতির এই পাখিটিও অবাধে ধরা হইতেছে ফাঁদ পাতিয়া। আর ধরা মাত্রই শামুকখোলের দুই চোখ ফুটা করিয়া দেওয়া হয়— যেন শিকারিদের হাতে ধরা পড়িয়া গেলেও পাখিটিকে আর অবমুক্ত করা না যায়। জীবজন্তুর প্রতি এই ধরনের নিষ্ঠুরতা দণ্ডনীয় অপরাধ। এ-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট আইন আছে। আছে বিশ্বব্যাপী প্রাণীকুলের প্রতি মানুষের অতুলনীয় মমত্ববোধের অজস্র দৃষ্টান্ত। সংবাদপত্র ছাড়াও স্যাটেলাইট টিভি ও ইন্টারনেটের বদৌলতে প্রতিনিয়ত আমরা তাহা প্রত্যক্ষ করিবারও সুযোগ পাই। তাহা সত্ত্বেও আমাদের দেশে কার্যকরভাবে নিষ্ঠুরতার লাগাম টানিয়া ধরা যাইতেছে না। অপ্রিয় হইলেও সত্য যে, এই বাস্তবতা বাংলাদেশের একার নহে। অতি সম্প্রতি কলকাতায় ১৬টি কুকুরশাবককে নির্দয়ভাবে পিটাইয়া হত্যা করা হইয়াছে। ইতোমধ্যে শনাক্তও করা হইয়াছে ঘাতকদের। এই ঘটনা লইয়া এখন সারা পশ্চিমবঙ্গে তোলপাড় হইতেছে।     

জীবজন্তুর প্রতি নিষ্ঠুরতা আইন, ১৯২০-এর ৪(খ) ধারায় জীবজন্তুর প্রতি নিষ্ঠুরতাসহ হত্যার জন্য শাস্তির বিধান রহিয়াছে। এখানে জীবজন্তু বলিতে গৃহপালিত বা আটককৃত জন্তুকে বোঝানো হইয়াছে। এই আইনে বলা আছে, ‘কোনো লোক যদি কোনো জন্তুকে এমনভাবে বাঁধিয়া রাখে, যাহাতে জন্তুটি কষ্ট পায় বা জন্তুটি যন্ত্রণা ভোগ করে। এই অপরাধের জন্য এক শত টাকা জরিমানা কিংবা অনূর্ধ্ব তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হইবে।’ অথচ প্রতিনিয়তই আমাদের চোখের সামনেই এমনি অসংখ্য নিষ্ঠুরতার ঘটনা ঘটিতেছে। বাস্তবতা হইল, এই আইন প্রণীত হইবার পর অতিক্রান্ত দীর্ঘসময়ে অনেকদূর আগাইয়া গিয়াছে পৃথিবী। প্রায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসিয়াছে মানুষের চিন্তাভাবনায়। আর তাহার বৃহদংশ জুড়িয়া আছে প্রকৃতি ও প্রাণিজগতের সুরক্ষার প্রসঙ্গ। মানুষ উপলব্ধি করিতে শুরু করিয়াছে যে মানবজাতির অস্তিত্বের স্বার্থেই জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা অপরিহার্য। অবশ্য তাহার প্রভাব যে আমাদের দেশেও পড়ে নাই—তাহা বলা যাইবে না। অতীতের তুলনায় প্রাণিজগতের সুরক্ষা বিষয়ে জনসচেতনতা নিঃসন্দেহে অনেকটাই বৃদ্ধি পাইয়াছে। এমনকি গ্রামগঞ্জেও বিপন্ন প্রজাতির প্রাণীর জীবনরক্ষার দৃষ্টান্ত ক্রমশ বাড়িতেছে। বলা বাহুল্য, শুধু আইন দিয়া এই নিষ্ঠুরতা দূর করা যাইবে না, ইহার জন্য সবচাইতে বেশি প্রয়োজন জনসচেতনতা। সেই পাঠটি স্কুলপর্যায় হইতে শুরু করা গেলেই উত্তম।