সবজি উত্পাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় স্থানে রয়েছে। এখন শীতকাল। প্রচুর সবজি আসছে বাজারে। গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে এখন মুখরোচক খাবার হিসেবে প্রতিদিন পাতে আসছে বিভিন্ন প্রকার সবজি। এর কদর আছে শহরেও।
বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে যেন একাকার হয়ে মিশে আছে বিভিন্ন খাবার। এর সাথে সাম্প্রতিককালে নতুন মাত্রা যোগ করেছে আমাদের সবজি। বাংলাদেশি সবজির কদর এখন দেশে ছেড়ে বিদেশে, সুদূর ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে। মানুষের খাদ্য হিসেবে সবজির ব্যবহার অনেক পুরনো। এক সময় বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো আদিম মানুষগুলো তাদের ক্ষুধা মিটিয়েছে কাঁচা ফল-মূল ও শাক-সবজি দিয়ে। ফসল উত্পাদনের গোড়াতেই ছিল ফল-মূল ও শাক-সবজির চাষ। ক্রমেই মানুষ আবাদ করতে শিখেছে বিভিন্ন দানাদার শস্যসহ অন্যান্য ফসল। এরই মাঝে সম্প্রসারণ ঘটেছে শস্য বহির্ভূত কৃষি খাতের। খাদ্য তালিকায় স্থান করে নিয়েছে উচ্চ পুষ্টিমান সম্পন্ন অন্যান্য খাবার; কিন্তু মানুষের নিত্যদিনের আহারে শাক-সবজির গুরুত্ব ম্লান হয়নি কখনো।
সবজির আবাদ খুবই সহজ। বাড়ির আঙিনায়, পথের ধারে, কৃষকের মাঠে—সর্বত্রই সবজির চাষ করা যায়। ইদানীং সবজির চাষ হচ্ছে ঘরের ছাদেও। এর উত্পাদান হয় সারা বছর ধরে। সবজির প্রাপ্যতাও কম-বেশি সর্বত্র। এটি দামে সস্তা। খাদ্য হিসেবেও সবজি সহজ প্রাচ্য। আবাল-বৃদ্ধ বনিতা সবাই সবজি খেতে পারে। যারা মুটিয়ে গেছেন, কিংবা প্রাণিজাত খাবার পরিহার করছেন, তাদের জন্য প্রধান অবলম্বন সবজি। ধনী, গরিব এবং সাধারণ মানুষেরও প্রিয় খাদ্য সবজি। কম খরচে খাবার পরিবেশনের জন্যও চাই শাক-সবজি।
খাদ্য হিসেবে সবজির জনপ্রিয়তা এর পুষ্টিমানের জন্য। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ বিদ্যমান। সবজিতে আছে ভিটামিন এ ও সি। আছে প্রোটিন। আছে ক্যালসিয়াম ও লৌহ। একজন লোক প্রতিদিন ২২০ গ্রাম সবজি খেলে তার দেহে ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের তেমন ঘাটতি থাকতে পারে না। তাছাড়া সবজি আমিষ জাতীয় খাদ্যের আত্মীকরণে সহায়ক। এটা পাচনতন্ত্রের কার্যকারিতাও বৃদ্ধি করে। সবজিকে বিবেচনা করা হয় দেহ রক্ষাকারী খাদ্য হিসেবে। মানুষের অপুষ্টিজনিত রোগ যেমন—রাতকানা, অ্যানিমিয়া, গলগণ্ড, স্কেব ইত্যাদি দূর করা সম্ভব প্রতিদিন পরিমিত পরিমাণে সবজি খেয়ে। তা ছাড়া সবজিতে কিছু ফাইটোকেমিক্যাল বিদ্যমান থাকায় টিউমারসহ অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে সবজি অত্যন্ত সহায়ক।
পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে অনেক উচ্চমাত্রায় সবজির ভোগ হয়ে থাকে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও সবজির ভোগ বেশি। সেখানে অনেকেই নিরামিষভোজী। বাংলাদেশেও দিনের পর দিন সবজির ভোগ বাড়ছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় এখনো তা যথেষ্ট নয়। আমাদের দেশে বর্তমানে একজন মানুষ দৈনিক গড়ে প্রায় ১৬০ গ্রাম শাক-সবজি খেয়ে থাকে। চালসহ দানাদার শস্য গ্রহণ করে দৈনিক প্রায় পৌণে পাঁচশ গ্রাম। পক্ষান্তরে জাপানিরা দৈনিক ভক্ষণ করে প্রায় ৩০০ গ্রাম সবজি ও ৪০০ গ্রাম দানাদার শস্য। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রতি দৈনিক সবজি ও দানাদার শস্য গ্রহণের পরিমাণ যথাক্রমে প্রায় ৪০০ ও ২০০ গ্রাম। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে বাংলাদেশে সবজি খাওয়ার পরিমাণ আরো বৃদ্ধি করার সুযোগ রয়ে গেছে। তাতে চালসহ অন্যান্য দানাদার শস্যের উপর আমাদের অতিমাত্রায় নির্ভরতা কমে আসবে। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ঘটবে। দূরীভূত হবে পুষ্টিহীনতা। এর জন্য সবজির উত্পাদন বাড়াতে হবে।
বিগত দুই দশকে বাংলাদেশে সবজির আওতাধীন জমির পরিমাণ ও উত্পাদন দ্রুত বেড়েছে। ১৯৯৫-৯৬ সালে সবজির চাষাধীন জমির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৪১ হেক্টর। উত্পাদন ছিল ১২ লাখ ৪৩ হাজার ৯শ ১৯ টন। ২০০৫-০৬ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩ লাখ ২ হাজার ৪শ ৪৯ হেক্টরে এবং ২০ লাখ ৫৪ হাজার ১শ ৪০ টনে। ২০১৭-১৮ সালে তা আরো বেড়ে গিয়ে উন্নীত হয় যথাক্রমে ৮.৬ লাখ হেক্টরে এবং ১৫৯.৫ লাখ টনে। এত উচ্চ হারে প্রবৃদ্ধি ঘটার পরও আমাদের ভোগের জন্য প্রয়োজনীয় সবজি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ঘাটতি মেটাতে হলে উচ্চ ফলনশীল সবজির আবাদ সম্প্রসারণ করতে হবে। বাড়াতে হবে বীজের উত্পাদন।
সবজি প্রধানত দুই প্রকার। একটি গ্রীষ্মকালীন ও অপরটি শীতকালীন। খরিপ ও রবি সবজি। যে সমস্ত সবজি এপ্রিল থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে জন্মে সেগুলো গ্রীষ্মকালীন বা খরিপ সবজি। আর যেগুলো নভেম্বর থেকে মার্চ মাসের মধ্যে জন্মে সেগুলোকে শীতকালীন বা রবি সবজি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। খরিপ সবজির মধ্যে আছে বেগুন, ঢেঁড়স, মিষ্টিকুমড়া, পটল, কাঁকরল, চিচিংগা, ডাঁটা, লালশাক, পুঁইশাক, ঝিংগা, বরবটি, করলা, শসা ইত্যাদি। রবি সবজি বা শীতকালীন সবজিগুলোর মধ্যে ফুল কপি, বাঁধা কপি, ওলকপি, শালগম, টমেটো, মুলা, লাউ, বেগুন, সিম, গাজর, লেটুস, পালং শাক ও ব্রকলি অন্যতম। বাংলাদেশে উত্পাদিত শতকরা ৬৮ ভাগই রবি বা শীতের সবজি। কিছু সবজি উভয় মৌসুমেই জন্মে অর্থাত্ সারা বছর জন্মে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- বেগুন, কচু, ডাঁটা, পেঁপে, কাঁচকলা ও সজিনা। তবে বছরের দুটো সময়ে (এপ্রিল-মে এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) সবজির সরবরাহ কম। গবেষণার মাধ্যমে সবজি উত্পাদনে এই মৌসুমী ব্যবধান ঘুচিয়ে দেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশে গড়পরতা সবজির ঘাটতি থাকলেও কোনো কোনো সময়ে সবজির সরবরাহ থাকে প্রচুর। তখন দাম পড়ে যায়। সবজি বিক্রি করতে গিয়ে যথেষ্ট লোকসান দিতে হয় কৃষকদের। আবার অন্য সময় বাজারে সবজির সরবরাহ থাকে কম। তখন এর মূল্য থাকে বেজায় চড়া। ভোক্তাদের পক্ষে যথেষ্ট পরিমাণে সবজি কিনে নেওয়া সম্ভব হয় না। গবেষণার মাধ্যমে সবজির মৌসুম প্রসারিত ও সমভাবে বিন্যস্ত করা সম্ভব হলে এ সমস্যাটি লাঘব হবে। এ ছাড়া সবজি প্রক্রিয়াজাত করে ও হিমাগারে রেখে এ সমস্যাটি মোকাবেলা করা যায়। কিন্তু আমাদের দেশে সবজি প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের সুবিধা অপ্রতুল। এর উন্নয়ন দরকার। দেশের বিভিন্ন স্থানে মৌসুম-ভেদে সবজির দামে বিস্তর ফারাক থাকে। পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন করে এর সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে উত্পাদনকারীদের সমবায় বিশেষভাবে সহায়ক হতে পারে। তাছাড়া কৃষক ও ভোক্তাদের মধ্যকার বিস্তর মূল্য পার্থক্য কমিয়ে আনার জন্যও উত্পাদনকারীদের সমবায় গড়ে তোলা দরকার।
বাংলাদেশ বর্তমানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সবজি রপ্তানি করছে বিদেশে। বছরের পর বছর এর পরিমাণ ও আয় বাড়ছে। ১৯৯৩-৯৪ সালে সবজি রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮,৪২২ মেট্রিক টন। আয় হয়েছিল ৯.৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর ১৪ বছর পর ২০০৭-০৮ সালে সবজি রপ্তানি হয়েছে ৩৩.৬২ মেট্রিক টন। আয় হয়েছে ৬৯.১২ মিলিয়ন ডলার। গত বছর অর্থাত্ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রপ্তানি করা হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন। তাতে আয় হয়েছে প্রায় ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। রপ্তানিকৃত সবজিসমূহের মধ্যে আছে করলা, লাউ, শিম, কাঁচা মরিচ, লতি, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, শিমের বিচি, কাঁচা পেঁপে, ডাটা, পটল, চিচিঙ্গা, বেগুন, ঢেঁড়স ইত্যাদি। এগুলোর ভোক্তা মূলত বিদেশে বসবাসরত বাঙালিরা। পৃথিবীর ৩৫টি দেশে বর্তমানে বাংলাদেশের ফল ও সবজি রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, ইতালি ও অন্যান্য ২৮টি দেশ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে শাক-সবজির উত্পাদন ব্যয়বহুল। সে তুলনায় বাংলাদেশ থেকে সবজির আমদানি সুবিধাজনক। এ ক্ষেত্রে বিদেশি বাজারে বাংলাদেশি সবজি বিক্রি সম্প্রসারণের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। তবে এর জন্য বিদেশি বাজার চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে মানসম্মত বাংলাদেশি সবজির নিরন্তর সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার। সে লক্ষ্যে দরকার চুক্তিভিত্তিক ভালো মানের সবজি উত্পাদন। চাই সংগ্রহোত্তর যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ। আরো চাই এর উন্নততর গ্রেডিং, প্যাকেটজাতকরণ ও পরিবহন। এছাড়া বিদেশে সবজি পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত বিমান স্পেস নিশ্চিতকরণের সঙ্গে এর ভাড়া হ্রাস করাও সবজি রপ্তানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। সর্বোপরি যেটি প্রয়োজন, সেটি হলো বিদেশে বাংলাদেশি সবজির বাজার সম্প্রসারণের জন্য কূটনৈতিক সহযোগিতা।
সম্প্রতি বাংলাদেশে অর্গানিক সবজির আবাদ হচ্ছে। বিদেশে এগুলোর বেশ কদর আছে। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি মিশনগুলো এ লক্ষ্যে কাজ করতে পারে। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিদেশি বাজার ও পণ্যমূল্য সম্পর্কে আমাদের রপ্তানিকারকদের নিয়মিত অবহিত রাখা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রতিষ্ঠিত রেটেক্স ফাউন্ডেশন এ ক্ষেত্রে খুবই সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
বাংলাদেশে সবজির উত্পাদন মূলত বসতবাড়ি ভিত্তিক। তাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থানীয় জাত ও চিরায়ত উত্পাদন কৌশল ব্যবহূত হয়ে থাকে। এরূপ উত্পাদন থেকে প্রথমত পারিবারিক চাহিদা মিটে। অতিরিক্ত সবজি বাজারে বিক্রি করে মেটানো হয় উত্পাদন খরচ। অধিক মুনাফা অর্জনের নিমিত্তে বাণিজ্যিক সবজি চাষ এদেশে খুবই কম। কিন্তু দেশি ও বিদেশি বাজারে উন্নতমানের উদ্বৃত্ত সবজি পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ করতে হলে চাই ব্যাপকভিত্তিক বাণিজ্যিক সবজির উত্পাদন। তাতে উত্পাদন ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ নিশ্চিত করা যাবে।
শুধু সবজির ক্ষেত্রেই নয়, কৃষির সকল ক্ষেত্রেই উত্পাদনে ও বিপণনে প্রয়োজন বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে কৃষি ব্যবস্থা পুরোপুরিভাবে পরিচালিত হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে। বাংলাদেশেও কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ দরকার। এর জন্য পুঁজি, প্রযুক্তি ও যন্ত্রায়নের সমাহার প্রয়োজন। তাতে উত্পাদন বাড়বে। পণ্যের মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ফলে লাভবান হবে কৃষক।
n লেখক: কৃষি অর্থনীতিবিদ
