প্রকৃতি

আঁখি জুড়ায় অতিথি পাখি

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:২৩

বাংলাদেশে সারা বছরই কোনো না কোনো মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। কৃষিমেলা, সবজিমেলা, ফলমেলা, মাছমেলা, গাছমেলা, বাণিজ্যমেলা, পিঠামেলা, বৈশাখীমেলা, পর্যটনমেলা—আরও কত কি মেলা তা বলে শেষ করা যাবে না। যেভাবেই এসব মেলা শুরু হয়ে থাকুক না কেন, প্রত্যেকটি মেলার রয়েছে আলাদা গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা। এমনই একটি মেলা হলো পাখি মেলা। সময়ের ব্যবধানে এটি অন্যতম প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে পরিবেশবাদী একটি মেলায় পরিণত হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর শীতকালে যে অতিথি পাখিকুলের আগমন ঘটে, তা দেশবাসী সকলেই কমবেশি অবগত। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের যারা আছেন তারা তো এ অতিথি পাখি গমনাগমনের বিষয়টি উপভোগ করেনই, সেইসঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এমনকি বিদেশের অনেক জায়গা থেকেও ছুটে আসেন মানুষ। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উঠা-নামার নয়নাভিরাম দৃশ্য উপভোগ করার আনন্দ অতুলনীয়। অথচ জাবি-তে মাত্র কয়েকটি বদ্ধ জলাশয়ে এ পাখিগুলো সুদূর ইউরোপ, আফ্রিকা থেকে হাজার হাজার মাইল অর্থাত্ সাত সাগর তের নদী পাড়ি দিয়ে চলে আসে। শীত চলে গেলে আবার তারা ফিরে  যায়। কী মধুর প্রাকৃতিক যোগসূত্র!

দেশে এমন আরও অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে এভাবে ভিনদেশি পাখিগুলো উড়ে আসে। এটি একটি প্রাকৃতিক সমন্বয়। মানুষ যেমন কর্মের খাতিরে এক দেশ থেকে অন্য দেশে চড়ে বেড়ায়, ঘুরে বেড়ায়, ঠিক তেমনই এ অতিথি পাখিগুলো দেশ হতে দেশ-দেশান্তরে ছুটে বেড়ায়। এদের অতিথি পাখি বা মাইগ্রেটরি বার্ডস কিংবা পরিযায়ী পাখি বলে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। এসব পাখি নিয়ে এখন অনেক গবেষণা চলছে। প্রাণীরা প্রভুভক্ত হয়ে থাকে। যেখানে মনে করবে তাদের বসবাসের জন্য উপযুক্ত জায়গা রয়েছে সেখানেই তারা এসে আশ্রয় নেবে। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখন আর সেই সুদিন নেই। যেখানেই এসব অতিথি পাখি এসে নিরাপদ আশ্রয়স্থল খুঁজছেন সেখানেই একদল নির্মম শিকারির কবলে পড়ছে তারা। 

সমতলভাগে বলতে গেলে ঢাকার অতি সন্নিকটে সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যে অতিথি পাখির আগমন ঘটে, এটি সারাদেশের একটি জায়গা মাত্র। তার পাশাপাশি বৃহত্তর সিলেটের হাওরাঞ্চলে এর আধিক্য সবচেয়ে বেশি। কারণ সেখানে হাকালুকি হাওর, টাঙ্গুয়ার  হাওর, পাইক্ষার বিল ইত্যাদি এলাকায় এসব শীতের পাখির বিচরণক্ষেত্র। তবে আগেই বলেছি এসব স্থানে আর পাখিকুল নিরাপদে বসবাস করতে পারে না। সরকার থেকে এসব এলাকা পাখ-পাখালি বসবাসের জন্য অভয়ারণ্য ঘোষণা করলেও তা মানছে না কেউই।

শুধু তাই নয়, পাখি বিশ্রাম নেয় গাছ-গাছালির ডালে বসে। তা ছাড়া অনেক পাখি আছে যারা ডিম পাড়ে গাছের গুহায়, নিরাপদ বাসা তৈরি করে গাছের ডালে, গাছের পাতা কিংবা খড়কুটো দিয়ে। কিন্তু এখন বনজঙ্গল উজাড় হয়ে যাচ্ছে। সে কারণে হুমকির মুখে পড়ছে পাখির নিরাপদ আবাসস্থল। দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনসহ যেকোনো স্থানের গাছ-গাছালি উজাড় হয়ে যাওয়ার কারণে অতিথি পাখির আগমন দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। আর তা আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়ছে। কারণ জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশের সব জীবজন্তু মানুষ পক্ষীকুল সবকিছু একে অপরের পরিপূরক হয়ে থাকতে হবে। তাই এমন পাখি মেলা করে বাংলাদেশে অতিথি পাখির গুরুত্ব অনুধাবন করার বিষয়টি খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। এভাবে চলতে থাকলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে উঠবে এবং প্রকৃত অর্থেই রক্ষা পাবে অতিথি পাখিসহ অন্যান্য সকল পক্ষীকুল—সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।

এবারের ১৮তম পাখি মেলাটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য উদ্বোধন করেছেন। অনুষ্ঠানটি প্রতিবছর আয়োজন করে গৌরবের ভূমিকায় থাকে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগ। সঙ্গে আরও ছিলেন পাখি বিশারদ ড. ইনাম আল হক, বিশিষ্ট প্রকৃতিপ্রেমী মুকিত মজুমদার বাবু।

n লেখক : কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]