দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২০, ১৯:৩৯

এইচ.এম. ফেরদাউস হাসান, প্রভাষক, বাংলা

মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ মিরপুর, ঢাকা

উপন্যাস:লালসালু

 

গতকালের পর

 

প্রশ্ন:উদ্দীপকটি পড় এবং নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:

বিধবা, নিঃসন্তান জয়তুন বেগমের সংসার আর চলছিল না। একদিন মাঝরাতে তিনি চিত্কার করে ঘুম থেকে জেগে উঠলেন এবং তারপর থেকেই তার সব আচরণ অস্বাভাবিক। দয়ারামপুর গ্রামের মানুষ বলাবলি করছে, স্বপ্নে তিনি এক বুজুর্গ ব্যক্তির কামিয়াবি হাসিল করেছেন। সবাই তার কাছে পানিপড়া আনতে যায়। জয়তুন বেগমের আয় রোজগার মাশাল্লা মন্দ নয়।

ঘ. উদ্দীপকের উল্লিখিত জয়তুন বেগম চরিত্রটি বিশ্লেষণ কর।

                ঘ) উচ্চতর দক্ষতামূলক:মানুষের মূল্যবোধ সমাজের সৃষ্টি। আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক অভিঘাতে এক একজন মানুষ গড়ে ওঠে একেকভাবে। উদ্দীপকের জয়তুন বেগমও আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক অভিঘাতে গড়ে ওঠে একটি জীবন্ত চরিত্র। ব্যাপারটি কীভাবে ঘটে, সেটি একটু বিশ্লেষণ করা যাক।

প্রথমত, জয়তুন বেগম যে এমন হলেন, তার জন্যে দায়ী তার অর্থব্যবস্থা। লক্ষণীয়, উদ্দীপকে বলা হয়েছে, তিনি বিধবা ও নিঃসন্তান। যদি তার স্বামী কিংবা সন্তান থাকতো, তাহলে বৃদ্ধকালে তাকে এই পানিপড়া ব্যবসায় নিশ্চয় নামতে হতো না। তিনি আর্থিক দিক থেকে অসহায়। তার আর কোনো উপায় ছিল না। তিনি যদি ভন্ড হতেন, তাহলে শুরু থেকেই পানিপড়া দিতেন, তা কিন্তু তিনি দেননি। তখনই দিয়েছেন, যখন দেয়ালে তার পিঠ ঠেকে গেছে। সুতরাং, অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত না থাকলে জয়তুন বেগম পানিপড়া দিতেন না।

দ্বিতীয়ত, জয়তুন বেগম যে এমন হলেন, তার জন্যে দায়ী আমাদের সমাজব্যবস্থা। আমাদের বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে অনাথ বৃদ্ধা নারীর একা বেঁচে থাকা খুব কষ্ট যদি তার না থাকে স্বামী, না থাকে সন্তান, না থাকে কোনো সম্পদ। গ্রামের মানুষ মুখে মুখেই ‘আহা’, ‘উহু’ করে কিন্তু একজন বৃদ্ধাকে নিজগৃহে ঠাঁই দেয় না। এক্ষেত্রে সেই বিখ্যাত উক্তিটি স্মরণ করতে পারি “জগতে কে কাহার”? আমাদের সমাজব্যবস্থা যদি উন্নত হতো, যদি মানবিক হতো, তাহলে আমার মনে হয় না এই বৃদ্ধা পানিপড়া দেওয়া শুরু করতেন। সমাজই তাকে বাধ্য করেছে।

এবারে আমরা আলোকপাত করতে চাই, একটা দেশের সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা কীভাবে সে দেশের মানুষকে নির্মাণ করে। উদ্দীপকের চরিত্রটির নাম ‘জয়তুন বেগম’। নাম শুনে বোঝা যাচ্ছে তিনি প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা। তিনি থাকেন দয়ারামপুর নামক গ্রামে এ কথাও উল্লেখ আছে; যে গ্রামের মানুষের চিন্তাজগত্ মূর্ত হয়েছে ‘বুজুর্গ’ ‘কামিয়াবি’; ‘হাসিল’ ইত্যাদি শব্দরাজির আশ্রয়ে এবং যে গ্রামের মানুষ পানিপড়ায় আস্থা রাখে। পানিপড়া সংস্কৃতিতে আস্থা থাকার কারণেই জয়তুন বেগম সৃষ্টি হতে পেরেছেন নতুবা পারতেন না। অন্যভাবে বলতে গেলে বলতে হয়: টাকার অভাব না হলে কিংবা সমাজব্যবস্থা মানবিক হলে অথবা কুসংস্কৃতি না থাকলে উদ্দীপকের জয়তুন বেগম চরিত্রটি কখনই এমন চরিত্রে বাঁক নিতেন না। সুতরাং বলা যায় মানুষ আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক চাপের ফসল।