করোনাকাল আমাদের
বিচ্ছিন্ন করেছে পৃথিবী থেকে। আড্ডাগুলো আজ স্মার্ট ডিভাইসে বন্দি। অনেক বন্ধুত্বের মধ্যে দেখা যাচ্ছে জোয়ারভাটা। কারো কারো ভার্চুয়ালি যোগাযোগমাধ্যমের প্রধান অন্তরায় ইন্টারনেট সংযোগ। বন্ধুত্বের ওপরে কতটুকু করোনার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক এ ক্লান্তিলগ্নে। তা নিয়ে কয়েক জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মনোভাব তুলে ধরেছেন হাজী দানেশ মোহাম্মদ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) শিক্ষার্থী— যোবায়ের ইবনে আলী
মুঠোবন্দি হয়ে উঠেছে বন্ধুত্ব
বেঁচে থাকা মানেই শুধু নিঃশ্বাস নেওয়া নয়। বেঁচে থাকার জন্য পরিবারের পাশাপাশি বন্ধুর সাপোর্ট গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু করোনা বন্ধুত্বের মধ্যে যেন এক দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভার্চুয়ালি যোগাযোগ সম্ভব হলেও মন খুলে বসে আড্ডা দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। মুঠোবন্দি হয়ে গেছে বন্ধুত্ব। করোনায় পড়াশোনার যাঁতাকল থেকে কিছুটা মুক্তি পেলেও সময়গুলো আস্তে আস্তে দুর্বিসহ হয়ে ওঠছে। সবার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হয় না। কিছু বন্ধুত্বেও মরিচা ধরে গেছে। শুনেছিলাম দূরত্ব বাড়লে নাকি ভালোবাসা বাড়ে। সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার প্রধান অস্ত্র যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া। এই মহামারির কারণে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠছে।
—আজাহার ইসলাম
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
বন্ধুর জন্য উত্কণ্ঠা আত্মার নিবিড় বন্ধন
বাকি অনেক সম্পর্কের মতো বন্ধুত্বে কোনো আইনি বা পারিবারিক বাধ্যবাধকতাও নেই। পুরোটাই মনের মিল। এই বাধ্যবাধকতাহীন সম্পর্কটাই একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় প্রভাব রাখে। কয়েকজন ভালো বন্ধু পাহাড় সমান বিপত্তিকেও পার করে দিতে পারে। স্থবির হয়ে যাওয়া এই সময় বোধহয় কিছু প্রকৃত বন্ধু চিনতে পারার পথ তৈরি করে দিয়েছে। প্রথম রোগী শনাক্তের পর ক্যাম্পাস ছুটি হয়ে যাওয়ার পরও যখন ঢাকায় থাকছিলাম, সেই সময়গুলোতে কয়েকজন বন্ধুর উত্কণ্ঠা দেখেছি আমাকে নিয়ে। বারবার কল করে বাসায় চলে যেতে বলছিল। যা আত্মার নিবিড় বন্ধন ছাড়া অসম্ভব।
—মো. সায়েম
বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় ( বুটেক্স)
কিছু সময় বন্ধু পাশে ছিল, আছে, থাকবে
এই করোনার ক্লান্তিলগ্নে বন্ধু মানেই রিক্রিয়েশন। সারা দিন বাসার মধ্যের একঘেয়েমিতে কাউকে পাশে না পেলেও বন্ধুরা ঠিকই ছিল। অনেকের পরিবারে শান্তি নেই, অনেকের পরিবার বেশি চাপ প্রয়োগ করে, অনেকের আবার সঠিক মূল্যায়নের অভাব। তবে এমন কিছু বন্ধু আছে। যারা সব সময় পাশে ছিল, আছে, থাকবে। সারা দিনের মন খারাপ নিমিষেই শেষ হয়ে যায় ক্ষণিকের অনলাইন আড্ডায়। বাবা-মায়ের কাছে হয়তো সব খুলে বলা যায় না। তবে বন্ধু থাকলে সব হতাশা গায়েব না হয়ে উপায় নেই। প্রায় সবাইকেই পাশে পেয়েছি। মনের অপ্রকাশিত অনেক কথা শেয়ার করেছি।
—সোহেল ইয়াসিন
শিক্ষার্থী, হাজী দানেশ মোহাম্মদ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
করোনা প্রকৃত বন্ধুদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে
সরাসরি বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ কমে গেলেও অনলাইনে চেষ্টা করি, সব বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে। অনলাইনে অনেকের কাছেই নিজের সুখ-দুঃখের কথা হয়তো শেয়ার করা যায়। কিন্তু প্রকৃত সমবেদনা জানানোর মতো লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। ভার্চুয়াল জগতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ এসব বন্ধুত্বের মধ্যে ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রভাব বেশি। সেজন্য, সুখে-দুঃখে পাশে পাওয়া মানুষের সংখ্যা নিতান্তই কম। কিন্তু, স্রোতের বিপরীতে এসে বেশকিছু বন্ধু সবসময় পাশে এসে দাঁড়ায়। করোনার ক্লান্তিকাল আমাদের শুধু ক্ষতি করেনি বরং আমাদের জীবনে পরিচিত করিয়ে দিয়েছে প্রকৃত বন্ধুদের।
—মো. ফাহাদ হোসেন
শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
