‘আবাদ করলে ফলত সোনা’

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২০, ২১:৪২

মানবজাতির সৃষ্টির সহিত ফলের রহিয়াছে অশেষ ভূমিকা। আদিমানব আদম ও হাওয়া বাগানে নিষিদ্ধ ফল খাইয়াছিলেন বিধায় সেই অপরাধে তাহারা পৃথিবীতে পদার্পণ করেন। পৃথিবীতে আসিয়াও প্রাকৃতিকভাবে জন্ম লওয়া ফলমূল আহরণ ও ভক্ষণ করিয়াই বাঁচিয়া থাকিত আদি মানবগোষ্ঠী। পুষ্টিবিজ্ঞানও বলিয়া থাকে—পুষ্টি, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের এক অফুরন্ত উত্স হইল ফল। বিচিত্র বর্ণ, আকর্ষণীয় স্বাদ ও গন্ধের জন্য ফল মানুষের অত্যন্ত প্রিয় খাদ্য। ফলকে রোগপ্রতিরোধক খাদ্য বলা হয়। মানুষ ছাড়াও অন্যান্য জীবজন্তু ও পশুপাখির প্রিয় খাবার ফল। সেই কারণে বাস্তুতন্ত্রে ফলের ভূমিকা শীর্ষস্থানীয়। তবে বাংলাদেশে ফলের আওতায় মোট আবাদি-চাষভুক্ত জমির পরিমাণ মাত্র ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অথচ জাতীয় অর্থনীতিতে মোট ফসলভিত্তিক আয়ে প্রায় ১০ শতাংশ আসিয়া থাকে ফল হইতে। তাহা ছাড়া বিদেশে তাজা-টাটকা ফল ও প্রক্রিয়াজাতকৃত মূল্যসংযোজিত ফলজাত দ্রব্যাদিরও প্রচুর চাহিদা রহিয়াছে। সুতরাং অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ হইতেও ফলের রহিয়াছে অপার সম্ভাবনা।

আধুনিক বাজারসভ্যতার সকল কিছু অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে বিচার করা হয়। অতএব, ফলের যদি বিশেষ অর্থকরী দিকটি বিকশিত হয়, তাহা হইলে ফল উত্পাদনের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্টদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাইবে। গত কয়েক দশকে ক্রমশ তাহা বিকশিত হইয়াছে বটে। আর ইহার নেপথ্যে বিশেষ ভূমিকা রাখিতেছে বিদেশি প্রজাতির বিভিন্ন ফল-ফলাদি। একটি সংবাদ প্রতিবেদনে জানা যায়, সরকারি হিসাবে গত ১০ বত্সরে দেশে আমের উত্পাদন দ্বিগুণ, পেয়ারা দ্বিগুণের বেশি, পেঁপে আড়াই গুণ এবং লিচু উত্পাদন ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাইয়াছে। আর ইহার নেপথ্যে রহিয়াছে বিদেশি প্রজাতির চমক। বিশেষ করিয়া, পেয়ারা ও পেঁপের উত্পাদন তাত্পর্যপূর্ণ মাত্রায় বৃদ্ধি পাইয়াছে বিদেশি প্রজাতির হাত ধরিয়াই। আবার আমের বেশির ভাগ জাত বাংলাদেশের নিজস্ব হইলেও ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ান কিছু জাত বত্সর জুড়িয়াই উত্পাদিত হয় বিধায় উহারা বারোমাসি হিসাবে পরিচিতি পাইয়াছে। বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র, বিশেষ করিয়া দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলে নারিকেল প্রায় সব বাড়িতেই দেখা যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভিয়েতনাম হইতে আসা নারিকেলগাছ লইয়া ব্যাপক উত্সাহ দেখা দিয়াছে। কারণ বাংলাদেশের নিজস্ব নারিকেলের তুলনায় ভিয়েতনামি নারিকেলগাছ অর্ধেকের কম সময়ে হইতে মাত্র দুই বা তিন বত্সরের মধ্যেই ফল দিয়া থাকে। এমনকি ইহার এক-একটি গাছ হইতে বত্সরে দুই শতাধিক নারিকেল পাওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশের মাটি, আবহাওয়া ও জলবায়ু ফল চাষের জন্য যথেষ্ট উপযোগী বিধায় প্রকৃতির অপার এই সম্ভাবনাকে পরিপূর্ণভাবে সদ্ব্যবহার করা প্রয়োজন। ফি বত্সর আমাদের দেশে ছোট-বড় চর জাগিয়া উঠে। নারিকেলসহ বিভিন্ন ফল চাষ করিবার জন্য সরকার লিজ দিতে পারে এই সকল খাস চর। ইহা ছাড়াও অনাবাদি, পতিত, আবাদি জমি, বসতবাড়িসহ চাষের উপযোগী প্রতিটি স্থানে ফলের আবাদ বৃদ্ধি করা খুব কঠিন কাজ নহে। তবে ফল সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ আমাদের দেশে এখনো খুব ভালো অবকাঠামো গড়িয়া উঠে নাই। উপযুক্ত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে এক-তৃতীয়াংশ ফল পচিয়া নষ্ট হইয়া যায়। সুতরাং সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়েও ফল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে উত্সাহিত করা প্রয়োজন। কোনো কিছুর অর্থনৈতিক মূল্য থাকিলে বহু ক্ষেত্রেই তাহার জন্য উদ্যোক্তাও জুটিয়া যায়। আশা করা যায়, অপার সম্ভাবনার বিভিন্ন ফলচাষও অচিরেই সমৃদ্ধ শিল্প হইয়া উঠিবে।