চট্টগ্রামে লাইসেন্স ছাড়াই চলছে মাদকাসক্তি চিকিত্সা

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২০, ২২:২০

চট্টগ্রামে মাদকাসক্তির চিকিত্সার নামে নৈরাজ্য চলছে। মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার নামে লাইসেন্স নিয়ে রোগী ভর্তি করে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি এসব নিরাময় কেন্দ্রের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো লাইসেন্স নেই। অধিকাংশ কেন্দ্রে নেই মাদকাসক্তি ও মনোরোগ বিষয়ে চিকিত্সক। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রশিক্ষিত জনবল ও অবকাঠামোর সুবিধা নেই। চিকিত্সার নামে আক্রান্তদের নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। আক্রান্তদের মাসের পর মাস আটকে রেখে চিকিত্সাবাবদ মোটা অঙ্কের টাকা আদায় চলছে। এসব প্রতিষ্ঠান তদারকিতে সরকারি সংস্থার কোনো কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না।

নগরীতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি ১৬টি মাদকাসক্ত পুনর্বাসন ও নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। তবে এর সংখ্যা আরো বেশি বলে জানা গেছে। এসব প্রতিষ্ঠান আবাসিক এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে মাদকাসক্তদের ভর্তি করে বিভিন্ন মেয়াদে চিকিত্সা দিচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে। চিকিত্সকরা জানান, বর্তমানে বিভিন্ন বয়সি মাদকাসক্ত রোগী বেড়েই চলেছে। ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইনসহ অন্যান্য মাদকে আসক্ত হয়ে এক পর্যায়ে তা মানসিক রোগে পরিণত হচ্ছে। সম্প্রতি ইয়াবা সেবন বৃদ্ধি পেয়েছে। চট্টগ্রামে সরকারি ২৫ শয্যার একটি মাদকাসক্ত চিকিত্সা কেন্দ্র রয়েছে। সরকারি চিকিত্সা কেন্দ্রের স্বল্পতার সুযোগে বেসরকারিভাবে যত্রতত্র মাদকাসক্তি নিরামায় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে উঠছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাকদাসক্তির চিকিত্সার জন্য সরকারি যে বিধিমালা রয়েছে তা মানা হচ্ছে না।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, স্থাপিত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করে রোগীর চিকিত্সা কার্যক্রম পরিচালনা করলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স নিতে হবে। যদি মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র হয় তাহলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স লাগবে না। এ ব্যাপারে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি ইত্তেফাককে বলেন, চট্টগ্রামে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্সপ্রাপ্ত দুটি মাদকাসক্ত চিকিত্সা কেন্দ্র রয়েছে। রোগী ভর্তি করে চিকিত্সা দিলে আমাদের লাইসেন্স নিতে হবে।’ অথচ চট্টগ্রামে মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রের নামে লাইসেন্স নিয়ে রোগী ভর্তি করে চিকিত্সা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। নেই চিকিত্সক ও নার্স।

নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় অবস্থিত ‘নীল’ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠানটি মাদকদ্রব্য অধিদপ্তর থেকে ১০ বেডের লাইসেন্স নিয়ে মাদকাসক্তদের চিকিত্সা কার্যক্রম চালাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের মালিক ইমরান হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ২০১৩ সাল থেকে আমরা কার্যক্রম শুরু করলেও ২০১৮ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্স পেয়েছি। আমাদের ১০ জন রোগী চিকিত্সাধীন আছে। অধিকাংশই ইয়াবা ও গাঁজায় আসক্ত। এই বিষয়ে আমার নিজেরও অভিজ্ঞতা রয়েছে। কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে বেশির ভাগ রোগী চিকিত্সা দিয়ে থাকি। বিভিন্ন মেয়াদে আক্রান্তদের চিকিত্সা চলে। মনোরোগ বিষয়ে স্থায়ী কোনো চিকিত্সক নেই।’ নগরীর মুরাদপুরে অবস্থিত ‘এলার্ট’ মাদকসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের মালিক সাহেদুল আলম শাকিল বলেন, আমরা মেডিসিন ও কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে মাদকাসক্তদের চিকিত্সা দিচ্ছি। বর্তমানে ১৫ জন রোগী  ভর্তি আছে। এক জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মাসে দুই-এক বার এসে রোগীদের চিকিত্সা দেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স নেই।’ আলো মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের মালিক মঈনুল হক বলেন, আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স নেই। এখন ১৭ জন মাদকাসক্ত ব্যক্তি চিকিত্সাধীন রয়েছে।’

চমেক হাসপাতালের মানসিক বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ডা. আবদুল মোত্তালিব ইত্তেফাককে বলেন, বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে চিকিত্সা ও পুনর্বাসন অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে হচ্ছে। রোগীদের সঙ্গে কয়েক মাসের চুক্তি করে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হচ্ছে। চিকিত্সার নামে রোগীদের নির্যাতন করা হয়। তাদের কোনো মনোরোগ চিকিত্সক নেই। অনেকেই মানসিক রোগীদেরও ভর্তি করাচ্ছে। সরকারি সংস্থাও এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’

চট্টগ্রামে সরকারিভাবে ২৫ বেডের একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে সাত জন রোগী চিকিত্সাধীন আছে। প্রয়োজনীয় চিকিত্সক, নার্সসহ জনবলের ব্যাপক সংকট রয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রো কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, বেসরকারি প্রতিটি মাদকাসক্তি পুনর্বাসন ও নিরাময় কেন্দ্রগুলোর কমপক্ষে দুই জনকে ঢাকা থেকে প্রশিক্ষণ নিতে হয়। প্রশিক্ষণে তাদের মাদকাসক্তি ব্যক্তিদের কাউন্সিলিং বিষয়ে ধারণা দেওয়া হয়। আমরা এসব প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব চিকিত্সক, নার্স ও রোগীরা কেমন চিকিত্সা পাচ্ছেন তা তদারকি করে থাকি।