রোহিঙ্গারা ইয়াবার সঙ্গে স্বর্ণ ও অস্ত্র কারবারে জড়িয়ে পড়ছে

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২০, ২২:২১

উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে প্রায় সাড়ে ৯ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। অধিকাংশ কর্মহীন, বেকার রোহিঙ্গা ইয়াবার বিনিময়ে সংগ্রহ করছে অস্ত্র। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে আনা হচ্ছে ইয়াবা ও স্বর্ণের বার। অবৈধ মালামালের কর্তৃত্ব ও ভাগাভাগি নিয়ে ক্যাম্পে প্রায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হচ্ছে। গত এক মাসে বিভিন্ন ঘটনায় ক্যাম্পে প্রায় ১০ জন রোহিঙ্গা মারা গেছে। এ ব্যাপারে থানায় বেশ কয়েকটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝেমধ্যে কিছু কিছু চালান আটক করছে। কিন্তু বেশির ভাগ চোরাচালানের অংশ থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধ মাদক, অস্ত্র ও স্বর্ণ পাচার করতে গিয়ে গত তিন মাসে শুধু বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) হাতেই আটক হয়েছে ২০ জন রোহিঙ্গা। আটক আট জন কুতুপালং লম্বাশিয়া ক্যাম্পের।

প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গার বসবাস কুতুপালং লম্বাশিয়া ক্যাম্পে। এ কারণে ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ আনতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রভাবশালীরাও নিরন্তর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। বিশেষ করে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পটিতে নিয়মিত সহিংস ঘটনা ঘটছে বলে দাবি করছেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েক জন ক্যাম্পের দায়িত্বরত মাঝি।

ঘুমধুম ইউপি চেয়ারম্যান একে জাহাঙ্গীর আজিজ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, উখিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকা সংলগ্ন নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নে বৃহত্তর জায়গা নিয়ে উখিয়া ও ঘুমধুমের অবস্থান। ঘুমধুম ইউনিয়নের দক্ষিণ পূর্বে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ। চোরাকারবারিদের জন্য এ স্থানটি অত্যন্ত পরিচিত এবং সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ার সুবাদে রাখাইন হয়ে তুমব্রু আবার তুমব্রু হয়ে সরাসরি ঘুমধুম, বালুখালী তথা বিভিন্ন ক্যাম্পে সরাসরি আশ্রয় নেওয়া সম্ভব বিধায় এ পথে বর্তমানে ইয়াবা ও স্বর্ণের বার পাচার হয়ে আসছে। তাছাড়াও এখানে রোহিঙ্গারা ভোটার হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় একটি জনগোষ্ঠী মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের ভোটার করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। এসব অপরাধীর অপরাধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে ৬৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে সর্বাক্ষণিক তত্পরতায় রয়েছে বিজিবি সদস্যরা। এমনটি জানিয়েছেন, কক্সবাজার ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক আলী হায়দার আজাদ। তিনি আরো বলেন, বিজিবির দুঃসাহসিক অভিযান ও নিরন্তর প্রহরার কারণে চোরাচালানিরা অনেকটা থমকে গেছে।

বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, ১ নভেম্বর রাতে বিজিবির ঘুমধুম বিওপির সদস্যরা উখিয়ার পালংখালীর কুড়ারপাড়া এশিয়ান হাইওয়ে থেকে কলিম নামে এক রোহিঙ্গার দেহ তল্লাশি করে ৩১টি স্বর্ণের বার ও বিভিন্ন ধরনের স্বর্ণালংকার উদ্ধার করে। গত ৫ নভেম্বর ২ লাখ পিস ইয়াবাসহ ছয় জনকে আটক করে। ইয়াবা পাচারের ঘটনায় নেতৃত্বে ছিলেন উখিয়ার থাইংখালী গ্রামের বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন। তিনিও বিজিবির হাতে আটক হন। এছাড়াও রেজু আমতলী বিজিবির একটি দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় প্রায় ৬ কোটি টাকার ইয়াবা উদ্ধার করে। 

কক্সবাজার জেলা পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, গত দুই বছরে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৩৩ জন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। এছাড়া নিজেদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বে আরো ৪৩ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী মারা গেছে।  এ দুই বছরে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ৪৭১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে মাদক সংক্রান্ত। তাছাড়া মানব পাচারের অভিযোগে চারটি মামলাসহ অস্ত্র, ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, নারী নির্যাতন, অপহরণ ও পুলিশের ওপর হামলার মামলা রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, ক্যাম্পভিত্তিক মাদকব্যবসা রোহিঙ্গা অর্থের একটি বড় উত্স। মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবা ক্যাম্পে মজুত করে এখান থেকেই হাতবদলের মাধ্যমে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে ইয়াবার চালান। গত ২ অক্টোবর কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশে পালংখালীতে একটি অস্ত্র তৈরির কারখানার সন্ধান পেয়ে অভিযান চালায় র্যাব। সেখান থেকে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র, দুই রাউন্ড গুলি এবং অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ আহমেদ সনজুর মোরশেদ জানান, ক্যাম্পের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য স্বল্পসংখ্যক পুলিশ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও মাদক পাচার প্রতিরোধে পুলিশ সার্বক্ষণিক তত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছে।