বঙ্গবন্ধু স্বল্প সময়ে আমাদেরকে একটি শ্রেষ্ঠ সংবিধান দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী। রবিবার মুজিববর্ষ উপলক্ষে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে রাষ্ট্রপতির ভাষণের মধ্য দিয়ে গত সোমবার বিশেষ অধিবেশন শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিববর্ষের উপর সাধারণ আলোচনার প্রস্তাব আনেন। তারই ধারাবাহিকতায় চীফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী এমপি আজ মুজিববর্ষের সমাপনী দিনে বক্তব্য রাখেন।
সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, 'সকলকে মুজিববর্ষের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী আলোচনায় আমাকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আমি আমার আলোচনার শুরুতে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুসহ ১৫ ই আগস্ট তার পরিবারের সকল শহীদ সদস্যদের প্রতি। শ্রদ্ধার সাথে আরো স্মরণ করছি ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, জেলখানার শহীদ ৪ নেতা, ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলাসহ প্রগতিশীল সকল আন্দোলনের শহীদদের প্রতি।
বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, জেল-জুলুম, দেশের প্রতি ও মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা, সাধারণ জীবন যাপন, সাংগঠনিক দক্ষতা, ঐতিহাসিক ভাষণ, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য জাতিকে প্রস্তুতকরণ দিকগুলো উঠে আসে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতিসহ দেশ পরিচালনা, দেশকে পুনর্গঠনসহ প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর যে বিশাল দায়িত্ব তিনি পালন করছিলেন সে বিষয়ে আলোকপাত করতে হয়। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ স্বাধীন করার পর দেশকে সোনার বাংলা হিসাবে গড়ে তোলার প্রত্যয়ে যে সকল বিষয়ের কাজ শুরু করেছিলেন সে সকল বিষয় থেকে কিছু আলোচনা করতে চাই। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বল্প সময়ে নিজের দক্ষতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন। সেই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব তাঁর যোগ্যতা ও সক্ষমতা পরিচয় বহন করে।
স্বাধীন দেশের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অতি অল্প সময়ে তিনি যে সকল উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন বিভিন্ন উপায় উদ্ভাবন করেছিল, প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা আইন ও নীতি প্রণয়ন করেছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণের ক্ষেত্রে তার তুলনা আর পাওয়া যায় না।
বঙ্গবন্ধু স্বল্প সময়ে আমাদেরকে দিয়েছেন একটি শ্রেষ্ঠ সংবিধান। ৩০শে জুন ১৯৭২ সালে দেশের প্রথম বাজেট পেশ করা হয়। মাত্র ছয় মাসের মধ্যে বাজেট প্রণয়ন করা ছিল খুবই কঠিন একটি কাজ। বাজেটে কোন নতুন কর আরোপ করা হয়নি, যাত্রী ও মালের ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়নি, ১৪ এপ্রিল ১৯৭২ সাল পর্যন্ত বকেয়া ও সুদসহ কৃষি জমির খাজনা মওকুফ করা হয়। জমি সেচের বকেয়া মওকুফ করা হয়। শহরের সমস্ত বাড়ির বকেয়া টেক্সসহ ২১ শে মার্চ পর্যন্ত সমস্ত পাওনা মওকুফ করা হয়। ইজারা প্রথা বাতিল ঘোষণা করা হয়। কৃষি আয়ের উপর থেকে কর প্রত্যাহার করা হয়। বাজেটে কৃষিতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়।
ভারত থেকে ফেরত প্রায় এক কোটি শরণার্থীদের পুনর্বাসন করা হয়। দুই লক্ষ বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসন করা হয়। সচল করা হয় শিল্প-কলকারখানা । যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত সেতু, সড়ক, রেলপথ, বিমানবন্দর, নদীবন্দর, সমুদ্রবন্দর এবং সকল অর্থ সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল করা হয়েছিল। যা ছিল একটি কঠিন কাজ।'
তিনি আরও বলেন, 'বঙ্গবন্ধু জানতেন বাংলাদেশের মতো সীমিত ভূমি ও বিশাল জনসংখ্যার দেশকে টিকে থাকতে হলে বহি:বিশ্বের সহযোগিতার বিকল্প নেই। বাংলাদেশকে উন্নত ও মর্যাদাশীল ভাবমূর্তি সম্পন্ন দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে না পারলে বাংলাদেশ বিশ্ব সমাজ থেকে তার ন্যায্য হিস্যা ও সম্মান পাবে না। তাই বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি আদায়, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশেকে অন্তর্ভুক্ত করা, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান করে বাংলাদেশকে সবার কাছে তুলে ধরাই ছিলো বঙ্গবন্ধুর প্রধান কাজ। জোট নিরপেক্ষতা বজায় রেখে বঙ্গবন্ধু বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বাংলাদেশ সকল দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করে একদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
বঙ্গবন্ধু দেশ গঠনের শুরুতেই বিভিন্ন কর্মসূচী হাতে নিয়ে গৃহহীনদের জন্য গৃহ নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। দরিদ্র মানুষদের মধ্যে নগদ অর্থ, খাদ্যসামগ্রী বিতরণের ব্যবস্থা করেন। কামার-কুমার, তাঁতি, জেলে, মিস্ত্রিদের অর্থ সাহায্য দেয়ার ব্যবস্থা করেন। ছাত্র-শিক্ষকদের সাহায্য দেন। এতিম ও অভিভাবকহীন মহিলাদেরকে এতিমখানা ও আশ্রয় শিবির নির্মাণ করে দেন।'
এ সময় তিনি বলেন, 'বঙ্গবন্ধু অল্পসময়ের মধ্যে পাকসী সেতু চালু করে তিস্তা রেল সেতুসহ সকল রেল সেতু চালু করেন। সড়ক পথে সেতু নির্মাণ করে সড়ক গুলোকে সচল করেন। মাইন অপসারণ ও ডুবিয়ে দেওয়া জাহাজ উত্তোলন করে চট্টগ্রাম বন্দর কে চালু করেন। বন্ধ থাকা মিল কারখানা গুলো পুনরায় চালু করে দেশের অর্থনীতিকে সচল করেন। বিদ্যুৎ লাইন সংস্কার ও গ্রিড পুনরায় চালু করেন। যমুনা নদীতে সেতু নির্মাণ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। দক্ষিণ বঙ্গের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক নির্মাণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যা ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেন। পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ আজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।'
বঙ্গবন্ধুর উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলো উল্লেখ করে তিনি বলেন, সামাজিক স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন, চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া, ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সকল ধর্মের প্রতি সহমর্মিতা এবং ভ্রাতৃত্ব স্থাপন, শ্রমিকসহ অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন, গ্রামীণ উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, খেলাধুলার মান উন্নয়ন করা, বিচারব্যবস্থাকে জনকল্যাণে প্রবর্তন করা এবং অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সকল মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা ছিলো তার উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।
তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা না হলে আমরা যে ২০২১ ও ২০৪১ সালের ভিশন নিয়ে কথা বলছি তা অনেক আগেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়াসহ তার অসমাপ্ত কাজ আজ বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাস্তবায়িত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ আজ সারা পৃথিবীতে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। আমরা ভাগ্যবান এই মহান সংসদে আজ আমরা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করতে পারছি। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু থাকবে।'
ইত্তেফাক/জেডএইচডি
