জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে বিশালত্ব, দীর্ঘ সংগ্রামী জীবন, আদর্শ, দর্শন ও মহানুভবতা, সে সম্পর্কে সবাই মিলে বললেও শেষ করা যাবে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন আলোচনা করেও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে পুরোপুরি বোঝানো সম্ভব নয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ’ উদ্যাপন উপলক্ষ্যে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আনা প্রস্তাবের ওপর গতকাল রবিবার আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা প্রায় অভিন্ন কণ্ঠে এ কথা বলেন।
বেগম মুজিবকে বাদ দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে চিত্রিত করা হলে সেটি হবে খণ্ডিত :মতিয়া চৌধুরী
আলোচনায় অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, বেগম মুজিবকে বাদ দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে চিত্রিত করা হলে সেটি হবে খণ্ডিত ও অসম্পূর্ণ। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি কাজে তিনি উত্সাহ ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আত্মার আত্মীয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু যখন ফাঁসির মঞ্চে যাচ্ছেন, তখন সবাই ছিলেন শঙ্কিত। এরপর বলা হলো, বঙ্গবন্ধু প্যারোলে আলোচনায় যাবেন। কিন্তু বেগম মুজিব সেদিন বলেছিলেন, উনি মুক্ত মানুষ হিসেবেই যাবেন। কেউ কেউ তখন বেগম মুজিবকে বলেছিলেন, ভাবী, আপনি তো বিধবা হয়ে যেতে পারেন। জবাবে তিনি বলেছিলেন, বিধবা হলে হব, তবু আমি চাই তিনি মুক্ত মানুষ হিসেবেই আলোচনায় যাবেন। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর ছায়াসঙ্গী হিসেবে নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছেন বেগম মুজিব।
মতিয়া চৌধুরী বলেন, ’৭৫-এর পর আমরা প্রথম ‘ফার্স্ট লেডি’ দেখতে পাই। মার্শাল লর পর এই ফার্স্ট লেডিরা নাকি অনেকভাবে উত্সাহ দিতেন। অথচ বেগম মুজিব ফার্স্ট লেডির তকমা গায়ে না লাগিয়ে দেশ স্বাধীনের পর ২ লাখ মা-বোনকে পুনর্বাসনের কাজে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন।
তিনি বলেন, বাঙালির মুখে হাসি ফোটানোর জন্য বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন। ক্ষুদ্র লোভে তিনি কখনো জনস্বার্থকে বিসর্জন দেননি। ফাঁসির মঞ্চ আর ফুলের মালা ছিল তার কাছে সমার্থক। জীবন-মৃত্যু ছিল পায়ের ভৃত্য, জনগণের ভালোবাসা ছিল তার কাছে আরাধ্য। মতিয়া চৌধুরী আরো বলেন, একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু যখন নানা পদক্ষেপ নিলেন, তখন দেশে-বিদেশে বিরোধিতারও সীমা-পরিসীমা ছিল না। বাংলাদেশ স্বাধীনের পর হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, এটা তার ব্যক্তিগত পরাজয়। এই কিসিঞ্জারদের চক্রান্তেই ’৭৪-এ খাদ্যের সংকট হয়। খাদ্যভর্তি জাহাজকে সেদিন পরিকল্পিতভাবে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। সময়মতো সেই জাহাজ বাংলাদেশে পৌঁছালে খাদ্যের সংকট হতো না।
সংসদে এই প্রস্তাব এনে প্রধানমন্ত্রী আমাদের দায়মুক্ত করেছেন :আলী আশরাফ
সরকারদলীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক আলী আশরাফ বলেন, ‘জন্মশতবার্ষিকীতে সংসদে শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রস্তাব এনে কার্যত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের দায়মুক্ত করেছেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি জাতির কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এটি (সংসদ) একটি জায়গা।’ তিনি বলেন, দেশ স্বাধীনের পর মাত্র ৯ মাসে বঙ্গবন্ধু জাতিকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ, উত্তম একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান উপহার দিয়েছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্বদেশে ফিরে আসার পর কিছুসংখ্যক লোক দেশে বিপ্লবী সরকার গঠনের কথা বলতে শুরু করলেন। এটা বাইরে যেমন ছিল, দলের ভেতরেও ছিল। শুধু সংবিধান দিয়েই বঙ্গবন্ধু শেষ করেননি, তিনি নির্বাচনও দিলেন। এভাবে সংসদীয় গণতন্ত্রের নমুনা বঙ্গবন্ধু পদে পদে স্থাপন করেছেন।
অধ্যাপক আশরাফ আরো বলেন, বঙ্গবন্ধু প্রথম প্রাথমিক শিক্ষকদের জাতীয়করণ করেন। আজ করোনার মধ্যেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাতদিন পরিশ্রম করছেন, প্রতিদিন নানা কর্মসূচি নিচ্ছেন। এটা বঙ্গবন্ধুরই একটা আদর্শ। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে খুনের পেছনে কারা মদত দিয়েছিল তা বের করতে হবে। খুনিদের এই সংসদে বসানো হয়েছিল। অনেকে এখনো জীবিত, তাদের খুঁজে বের করতে হবে।
আজকে সবাই আওয়ামী লীগ, আমাদের ভয় লাগে :ফিরোজ রশীদ
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, রাজনৈতিক আদর্শ যাচাই না করে আজ অনেককে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আজকে এত সমর্থন আওয়ামী লীগের! সবখানে আওয়ামী লীগ! বাকশালের সময়ও এমনটা দেখেছি। আমাদের ভয় লাগে। কোথায় কাকে রাখছেন, তাদের হিসাব করছেন? এই ছেলেটি কখনো ছাত্রলীগ করেছে? একদিন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েছে? তার বাবা-দাদা আওয়ামী লীগ করেছেন? তারা আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান?
’৭৫-এর ১৫ই আগস্ট নিহত হওয়ার সাড়ে চার ঘণ্টা আগে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাত্ হয়েছিল উল্লেখ করে ফিরোজ রশীদ বলেন, “মনি ভাইয়ের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সেদিন আমাদের ডেকে পাঠিয়েছিলেন। রাত সাড়ে ১১টায় আমাদের ডাকলেন। চারদিকে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আমাদের একটিমাত্র কথা বলেছিলেন, ‘তোমাদের সতর্ক থাকতে হবে। তোমাদের যুবলীগের একটি ছেলেও যদি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, আমি এক্সপেল করে দেব।’ এরপর মনি ভাইয়ের সাথে কথা বললেন। আমরা নিচে দাঁড়িয়ে থাকলাম। মনি ভাই নিচে নেমে একটি সিগারেট ধরিয়ে চলে গেলেন। একটা কথাও বললেন না। মুখটা মলিন ছিল। কী ষড়যন্ত্র ছিল? যেটা বঙ্গবন্ধু মনি ভাইকে বললেন। আর পরদিন! ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আমরা জানতে পারতাম, যদি বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতেন।”
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার নেপথ্যের ঘটনা উদ্ঘাটনে কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আজ পর্যন্ত আপনারা একটি কমিশন গঠন করতে পারলেন না! যারা আত্মস্বীকৃতি খুনি, তাদের বিচার করতে পারছি, কিন্তু এর পেছনে কী ছিল?’ ২৫ মার্চের একটি ঘটনার স্মৃতিচারণ করে ফিরোজ রশীদ বলেন, “ঐ সময় আমরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছি। ক্যাম্পে আছি। থমথমে পরিবেশ। আমরা বঙ্গবন্ধুর বাসায় গেলাম। তিনি নিচে নেমে আসলেন। বললেন, ‘তোমরা যাও। তোমাদের সমস্ত ব্যবস্থা আমি করেছি। যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও। ভয়ংকর যুদ্ধ হবে।’ বঙ্গবন্ধু তো প্রথম রাতেই যুদ্ধের ঘোষণা করে দিয়েছেন।”
স্বল্প সময়ে বঙ্গবন্ধু দূরদর্শিতা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন : চিফ হুইপ লিটন চৌধুরী
আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী (লিটন চৌধুরী) বলেন, বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে তার নেতৃত্ব, সাধারণ জীবনযাপন, আন্দোলন-সংগ্রাম, জেলজীবন, কর্মময় জীবনের কথা উঠে আসে। দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি ও দেশকে ঢেলে সাজানোর কথা বলতে হয়। স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে বঙ্গবন্ধু বহুমুখী উদ্যোগ নেন। অত্যন্ত স্বল্প সময়ে তিনি দূরদর্শিতা ও দক্ষতার পরিচয় দেন। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু যেসব উদ্যোগ নিয়েছিলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তা অতুলনীয়।
লিটন চৌধুরী বলেন, একটি নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণে বঙ্গবন্ধু মাত্র ছয় মাসে বাজেট প্রণয়ন করেন। বাজেটে তিনি কোনো কর বাড়াননি। কৃষিতে সব ধরনের কর প্রত্যাহার করেন। শিল্পকারখানাগুলোকে সংস্কার করে চালুর ব্যবস্থা করেন। যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত পুল-কালভার্ট-ব্রিজ সংস্কারের পর সচল করেন। দেশ গঠনের শুরুতেই তিনি বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। পাকশি সেতু চালু করেন। দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে রাস্তাঘাট করেন। সংস্কারের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর পুনরায় চালু করেন। এভাবে বহুমুখী পদক্ষেপের মাধ্যমে অর্থনীতিকে সচল করেন বঙ্গবন্ধু।
কিছু সাংবাদিক এত অকৃতজ্ঞ টিভি চ্যানেল নিয়ে সেখানে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করছেন : শফিকুর রহমান
চাঁদপুরের সরকারদলীয় এমপি ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে জাতীয় প্রেসক্লাবকে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া জায়গায় তারই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করেন। শফিকুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি ২০ তলা আধুনিক ভবন করে দেবেন। আমি আশা করি সেই ভবনটি হবে।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা গ্রন্থগুলো যদি ঠিকমতো পড়ি তাহলে দেখবেন তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ। বিশ্বে এমন রাজনীতিবিদ আর আসেননি। বঙ্গবন্ধু যে শুধু লিখেছেন, তা নয়। তিনি সাংবাদিকতাও করেছেন ইত্তেহাদে।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু জাতীয় প্রেসক্লাবের জন্য জমি দিয়ে গেছেন। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনের পর কিছু লোক হঠাত্ উদ্যমী হয়ে ওঠে প্রেসক্লাবের পাশের জমিটা দখল করার জন্য। তখন বঙ্গবন্ধু আতাউর রহমান খান সাহেবের সামনে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের কয়েকজনকে বলেছিলেন, তোরা আসিস আমি থাকব সেখানে। বঙ্গবন্ধু সেখানে যখন গেলেন, বললেন জাতীয় প্রেসক্লাব এটি থাকবে। জাতীয় প্রেসক্লাবের এই জমি আর কেউ নিতে পারেনি।
শফিকুর রহমান আরো বলেন, অত্যন্ত বেদনাদায়ক বঙ্গবন্ধুকে ১৫ আগস্ট হত্যা করার পর বাংলাদেশের কাগজে লেখা হয়েছে স্বৈরাচারের পতন ঘটল। অনেক কাগজে লেখা হয়েছে। ‘হক কথা’ বলে একটি কাগজ ছিল। সেই ‘হক কথা’ কিংবা জাসদের গণকণ্ঠ এই দুটি কাগজে অনেক ভিত্তিহীন যে সব লেখা হয়েছিল সেগুলো আসলে সাংবাদিকতাও ছিল না। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়াউর রহমান অলিখিত ফরমান জারি করলেন যে, বঙ্গবন্ধু বলা যাবে না, জাতির পিতা বলা যাবে না।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে সাংবাদিকদের জন্য একটি আইন করেছিলেন। সেই আইনের বলেই ওয়েজ বোর্ড হয়েছে। কয়েকবার ওয়েজ বোর্ড হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কোভিড-১৯ আসার আগ থেকে সাংবাদিকদের জন্য কল্যাণ তহবিল করেছেন। কল্যাণ তহবিলের অর্থ কমপক্ষে ৩০ কোটি টাকার কম হবে না। তাছাড়া প্রত্যেক দুস্থ সাংবাদিকের জন্য নগদ টাকাও দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর মতোই সাংবাদিকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলছেন। কিন্তু সাংবাদিকরা সবাই না, বেশির ভাগ এত অকৃতজ্ঞ যে উনার কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে ঐ টেলিভিশনে বসেই উনাকে নিয়ে সমালোচনা করে এবং অকথ্য ভাষায় কথা বলে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।
ষড়যন্ত্র এখনো চলছে : ইমাজ উদ্দিন
আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এখনো ষড়যন্ত্র চলছে। সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ষড়যন্ত্রকারী বসেছিল না, এখনো তারা বসে নেই। শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সবার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে।
