মাধব রায়
সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান)
ব্লু-বার্ড হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট
গতকালের পর
রেখা গান ধরল-
কঠিন লোহা কঠিন ঘুমে ছিল অচেতন
ও তার ঘুম ভাঙ্গাইনু রে।
অচল ছিল সচল হয়ে
ছুটেছে ওই জগত্ জয়ে
নির্ভয়ে আজ দুই হাতে তার
রাশ বাগাইনু রে।
গান শেষ হলে বিন্দু হাসতে হাসতে বলল- কঠিন গান।
আকাশ বলল- কিন্তু মামা, আইনস্টাইন এক মেরুর মহাপুরুষ, রবীন্দ্রনাথ অন্য মেরুর। তাঁদের দুজনের মধ্যে কী কথা হতে পারে?
হতে পারে, বললেন নীলকান্তবাবু। আইনস্টাইনের স্থান-কাল এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের কিছুটা ধারণা ছিল। রবীন্দ্রনাথ বললেন- আপনি গণিতের দুটো প্রাচীন সত্তা, দেশ ও কাল নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত, আর আমি অনন্ত বিশ্ব, বাস্তবতার বিশ্ব-এসব নিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছি।
আইনস্টাইন রবিঠাকুরকে সরাসরি প্রশ্ন করলেন-আপনি কি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন দৈব সত্তায় বিশ্বাস করেন?
রবিঠাকুর বললেন-বিচ্ছিন্ন নয়, মানুষের অনন্ত ব্যক্তিত্বই বিশ্বকে বোধগম্যতায় নিয়ে আসে। কোনও বস্তু প্রোটন ও ইলেকট্রন দিয়ে তৈরি, তাদের মধ্যে রয়েছে ফাঁক, কিন্তু বস্তুকে তো ঘনসংবদ্ধই মনে হয়। এতে তো কোনও ফাঁক মনে হয় না। একইভাবে মানুষ জগেক সপ্রাণ ঐক্য প্রদান করে।
আইনস্টাইন বলেন-বিশ্বের প্রকৃতি সম্পর্কে দুটি পৃথক ধারণা রয়েছে। এক-একটি অনন্য একক হিসেবে বিশ্ব বা প্রকৃতি যা মানুষের ওপর নির্ভরশীল, দুই-বিশ্বের বাস্তবতা মানব-নিরপেক্ষ।
বিন্দু অবাক হয়ে বলল-রবীন্দ্রনাথ কি ইলেকট্রন প্রোটন সম্পর্কে ধারণা রাখতেন?
অবশ্যই, বললেন নীলকান্তবাবু। রবীন্দ্রনাথ তো ‘বিশ্বপরিচয়’ নামে একটি বিজ্ঞানের বইও লিখেছিলেন। ১৯৩৭ সালে বইটি প্রকাশিত হয়। এই বইতে পাঁচটি প্রবন্ধের সবগুলোই বিজ্ঞানের। এর মধ্যে কোনও সাহিত্যিক দর্শন নেই।
চন্দ্রা এতক্ষণ অবাক হয়ে শুনছিল। সে বলল-প্রবন্ধগুলো কী কী?
নীলকান্তবাবু বললেন-এগুলো হচ্ছে পরমাণুলোক, নক্ষত্রলোক, সৌরজগত্, গ্রহলোক ও ভূলোক।
বিন্দু বলল-খালি লোক, লোক।
হ্যাঁ, বললেন নীলকান্তবাবু। বইটি লিখার জন্য রবীন্দ্রনাথকে অনেক কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে। ইংরেজি ভাষায় পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত কমপক্ষে আটটি বই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়েছিলেন তিনি। প্রথমে তিনি শান্তিনিকেতনে বিজ্ঞানের অধ্যাপক প্রমথনাথ সেনগুপ্তকে বিজ্ঞান বিষয়ক বই লেখার ভার দিয়েছিলেন। বই এর ভাষা তিনি নিজেই ঠিক করে দিতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরো বইটি তিনি নিজেই লিখেছিলেন।
অনেকক্ষণ পর নীলকান্তবাবু খেয়াল করলেন কমলার হাতে চা এর কাপ। তিনি বললেন-চা কি তুমি একাই খাবে, নাকি আমাদেরও দেবে? কমলা হেসে বললেন-দিচ্ছি।
