সবুজে ঘেরা মায়াময় সন্তোষের পীর শাহজামান দিঘির শান্ত জলে সকালের তরুণ আকাশ—ধ্যানমগ্ন। তারই এক পাশে অতি সাধারণ সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে অনুভব করার চেষ্টা করছিলাম—
’মহা-প্লাবনের পর নূহের গভীর মুখ...
কাশফুল দাড়ি উত্তরে হাওয়ায় ওড়ে।....
বল্লমের মতো ঝলসে ওঠে তাঁর হাত বারবার...
যেন তিনি ধবধবে একটি পাঞ্জাবি দিয়ে
সব বিক্ষিপ্ত বে-আব্রু লাশ কী ব্যাকুল ঢেকে দিতে চান।’
অকুতোভয় সেই সৈনিক যিনি বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য নির্যাতিত মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য শোষণহীন ন্যায়বিচারভিত্তিক ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ে তোলার প্রত্যয়ে সংগ্রাম করে গেছেন আজীবন।
খিলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, বাংলাভাষা আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ, ফারাক্কা লং মার্চ...সকল লড়াই-সংগ্রামের জন্য জেল-জুলুম ও হুলিয়াসহ নানা নির্যাতনের শিকার হলেও কখনো সরে আসেননি সংগ্রামের পথ থেকে। ‘মজলুম জননেতা’ এই পরিচয়ই যথেষ্ট তাঁকে চিনে নিতে।
তখন ব্রিটিশ ক্ষমতায়। তারই দাপটে জমিদাররা বেপরোয়া। বহুবার লাঠিয়াল লেলিয়ে দিলেও তিনি ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল এমনকি আসাম এলাকায় কৃষক-স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনে অগ্রনায়ক। কৃষকের সন্তান। দরিদ্র কৃষকের জীবনসংগ্রামই ছিল আজীবনের সাথি। কৃষকের জেগে ওঠার চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন বলেই তিনি জমিদারদের রক্তচক্ষুকে ভয় পাননি। রাজনৈতিক জীবনের হাতেখড়ি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের কাছে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সঙ্গে।
১৯৪৭-এর পর নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের চেহারা দেখে ঠিক চিনে নিয়েছিলেন শোষকবাহিনীকে। চিনেছিলেন শত্রুকে। শুরু করলেন সংগ্রাম। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের অগ্নিমন্ত্রে দাঁড়ালেন অগ্রণী ভূমিকায়। ১৯৫৭-তে কাগমারী সম্মেলন, সেখানে পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন পূর্ব বাংলাকে পশ্চিম পাকিস্তান বঞ্চিত করা অব্যাহত রাখলে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে এতোটুকু পিছপা হবেন না। বরং পাকিস্তানের প্রতি বিদায়ী বচন ‘আসসালামু আলাইকুম’ উচ্চারণ করলেন। পাকিস্তান শাসকশ্রেণির অন্তরে আতঙ্ক সৃষ্টি করে তুলে ধরলেন প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি।
আমলাতন্ত্র, জোদ্দারতন্ত্র ও সামরিকতন্ত্রের বিরোধিতা করে অনায়াসে তিনি বেরিয়ে এসেছিলেন মুসলিম লিগ থেকে। গড়ে তুললেন অসাম্প্রদায়িক চেতনায় আওয়ামী লিগ। নিজের হাতে গড়া এই দল থেকেও তিনি বেরিয়ে এসেছিলেন যখন দেখলেন কৃষকের স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে না।
তিনিই তো সেই নেতা যিনি বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠেছিলেন—‘ভোটের আগে ভাত চাই।’
নতুন উদ্যমে গড়ে তুললেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি—ন্যাপ।
১৯৭১, বাঙালির মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের কাল। পাকিস্তান হানাদারবাহিনীর হাতে ধরা না দিয়ে দেশবাসীর সঙ্গে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তে পায়ে হেঁটে যাত্রা করেছিলেন আসামের পথে। প্রতিহিংসায় টাঙ্গাইলের সন্তোষে তাঁর কুঁড়েঘরটি পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চিরচেনা সহজ মানুষটি মিশে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের অগণিত শরণার্থীর সঙ্গে। কে তাঁরে চিনতে পারে, কে পরায় তাঁর হাতে হাতকড়া?
তখন বয়স ৯০। মুজিবনগর সরকারের অভিভাবক হয়ে বাঙালির জাতীয়তাবাদ শক্তির পক্ষে সমর্থন জুগিয়ে গেছেন নিরলস।
তিনি মজলুম মানুষের নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।
দীর্ঘ সংগ্রামী জীবন শান্ত হলো ১৯৭৬-এর ১৭ নভেম্বর। সমাহিত হলেন সন্তোষের পীর শাহজামান দিঘির পাশে—জেগে রইলেন মানুষের হূদয়ে।
