ইকো-সিস্টেমে পরিবর্তনের প্রভাব

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০২০, ২১:২০

ঋতুচক্রের পরিবর্তনের ধারায় উত্তর গোলার্ধের শীতপ্রধান অঞ্চলে যেই সময় তীব্র শীত আর তুষারপাত আরম্ভ হয়, সেই সময়ে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দক্ষিণ গোলার্ধের অপেক্ষাকৃত উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে আশ্রয় লয়। প্রতি বত্সর হেমন্তের বিদায়লগ্নে শীতের আগমনী দিনগুলিতে সুদূর সাইবেরিয়া অঞ্চল হইতে ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখি আমাদের দেশে ছুটিয়া আসে। বিভিন্ন চরাঞ্চল এবং ঘন সবুজ বন-বনানীতে এই সকল অতিথি পাখি তাহাদের সাময়িক নিবাস গড়িয়া তোলে। আমাদের দেশের চরাঞ্চল, জলাভূমি, বিল-হাওর এই সকল অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হইয়া উঠে, জলকেলিতে কিচিরমিচির ছন্দে ইহারা জলাভূমির পরিবেশকে মোহনীয় করিয়া তুলে। এই সকল অতিথি পাখি কেবল সৌন্দর্য বৃদ্ধিই নহে, তাহারা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিয়া থাকে।

অতিথি পাখির চলাচলের পথ এবং আবাসস্থল লইয়া গবেষকগণ অদ্ভুত ও বিস্ময়কর সকল তথ্য প্রদান করিতেছেন। কোনো বিশেষ প্রজাতির পাখি যেই বত্সর যেই গাছে আশ্রয় গ্রহণ করে, পরের বত্সর বিশাল পথ পাড়ি দিয়া সেই গাছেই আশ্রয় লয়। অতিথি পাখিরা যেই সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়া আমাদের দেশে ভ্রমণ করিয়া থাকে, সেই পথও কুসুমাস্তীর্ণ নহে। যাত্রাপথে বহু শিকারি পাখি তাহাদের আক্রমণ করিয়া বসে। তাহার পরেও সুদীর্ঘকাল আমাদের দেশে মেহমান হইয়া আসিয়াছে। উদ্বেগের বিষয় হইল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারা বিশ্বের ইকো সিস্টেমের ক্ষতি হইতেছে। যাহার বিরূপ প্রভাব হইতে অতিথি পাখিরাও মুক্ত নহে। অবশ্য আবহাওয়া পরিবর্তনের এই বার্তা পাখিরাই প্রথম মনুষ্যজাতিকে অবগত করিয়াছিল। গবেষকেরা আশঙ্কা করিয়াছেন, বিশ্বব্যাপী উষ্ণতা বৃদ্ধি অনেক প্রজাতির পাখির দেশান্তর চক্রকে মারাত্মকভাবে ধ্বংস করিয়া দিবে। বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করিয়াছেন, পাখিদের দেশান্তরী হইবার ধরনও পরিবর্তন হইয়াছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উষ্ণতা বাড়িবার ফলে পাখিদের দেশান্তরী হইবার প্রবণতাও গত শতকের তুলনায় দেড় শত কিলোমিটার উত্তরে চলিয়া গিয়াছে। তবে শুধু প্রাকৃতিক কারণেই নহে, মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ফলাফলস্বরূপ বর্তমানে দেশান্তরী বা পরিযায়ী পাখিদের আবাসস্থল ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন হইয়াছে। বাংলাদেশে ইহার মাত্রা তীব্র। বন উজাড়, পানিদূষণ ও উপকূলীয় এলাকার উন্নয়নের ফলে অতিথি পাখিদের আশ্রয়স্থল মারাত্মকভাবে সংকুচিত হইয়া পড়িয়াছে। জলাশয়ে ব্যাপক হারে মত্স্য আহরণের ফলে মেস্যর জোগান হ্রাস পাইয়াছে। পাশাপাশি জলাভূমিতে কৃষি সমপ্রসারণ; অধিক ফলনশীল শস্য উত্পাদনের জন্য যথেচ্ছভাবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগের ফলেও ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে পাখিদের আবাসস্থল ও খাদ্যের জোগান। এই সকল কারণে প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানও বিপন্ন, ইহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। লক্ষণীয়, পূর্বের তুলনায় চোখে পড়িবার মতো কমিয়া গিয়াছে শীতকালীন পাখির আগমন। শঙ্কা হয়, তাহা হইলে কি অদূর ভবিষ্যতে বন্ধ হইয়া যাইবে ইহাদের আগমন?

পরিবেশের ইকো-সিস্টেম ধ্বংসের পিছনে প্রত্যক্ষভাবে মানুষের হাত রহিয়াছে। তবে পরিবেশ দূষণ, জলাধার ও বন ধ্বংস, পাখি শিকার এবং মত্স্যাধার বিনষ্ট করিবার যে প্রবণতা গড়িয়া উঠিয়াছে, তাহার ফলে অদূর ভবিষ্যতে এই দেশে অতিথি পাখির বিচরণ  যে আর দেখিতে পাওয়া যাইবে না, তাহা বলিয়া দেওয়া যায়।