দীর্ঘদিন যুদ্ধের পর গত ৯ নভেম্বর রাতে রাশিয়ার মধ্যস্থতায় আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের এক শান্তিচুক্তিতে একমত হয়। অধিকাংশ বিশ্লেষকই উক্ত শান্তিচুক্তিকে আর্মেনিয়ার পরাজয় হিসেবেই দেখছেন। এদিকে চুক্তির পর গোটা আজারবাইজান জুড়ে আনন্দের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে এবং প্রেসিডেন্ট ইলহাম অলিয়েভ একে তার দেশের জন্য ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অপরদিকে আর্মেনিয়ার জনগণ এই চুক্তি কোনোভাবেই মানতে পারছে না। চুক্তি ও সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মাধ্যমে তারা সর্বত্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে। আবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভাঙচুরের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি পার্লামেন্টের স্পিকারকে মারধরের কথাও অজানা নয়। আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এই চুক্তিকে নিজ দেশের জন্য অবর্ণনীয় ও বেদনাদায়ক বলে উল্লেখ করেছেন এবং বারবার বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে তার জনগণকে বুঝাতে চেয়েছেন যে, এই চুক্তিকে পরাজয় হিসেবে নেওয়া ঠিক হবে না। কারণ, চলমান সংকট সমাধানের জন্য সামগ্রিক দিক বিবেচনায় এটিই সবচেয়ে উত্কৃষ্ট ব্যবস্থা ছিল। বলা যায়, গত তিন দশকে আজারবাইজান যা শুধু স্বপ্নেই দেখেছিল, এই দেড় মাস সময়েই তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। চুক্তি থেকে বোঝা যায়, আজারবাইজান যুদ্ধ করে কারাবাখের অধিকাংশ এলাকা জয় করার পাশাপাশি বিনা যুদ্ধে আরো দুই-তিনটি এলাকার নিয়ন্ত্রণ পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
কারাবাখ ইস্যুতে শান্তিচুক্তি ছাড়া আর্মেনিয়ার আসলে বিকল্প কিছু ছিল না। এর পেছনে কিছু কারণও লক্ষণীয়। যেমনঃ এক. যে কারাবাখ নিয়ে ঝামেলা চলমান সেটি আন্তর্জাতিকভাবে আর্মেনিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকৃত নয় বরং তা আজারবাইজানেরই অংশ। নব্বইয়ের দশকে হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়ে দখল করাটা ছিল আর্মেনিয়ার এক ধরনের সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের ফসল। যেটি পুরোপুরি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি এবং নৈতিকতাবিরোধী কর্মকাণ্ড।
দুই. সাম্প্রতিক সংঘাতে আজারবাইজানের সেনাবাহিনী কর্তৃক আর্মেনিয়ার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার মূল্যের যুদ্ধসামগ্রীর ব্যাপক ক্ষতিসাধন, হাজারো সেনাবাহিনীর প্রাণহানি, প্রতিনিয়ত দখলকৃত ভূমি হারানোর ঘটনা অর্থাত্ ক্রমেই পরাজয়ের দিকে যাওয়া, অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধন, হাজার হাজার বেসামরিক লোকের হতাহত হওয়ার ব্যাপারও চুক্তিতে সম্মত হওয়ার কারণ হতে পারে।
তিন. ২০২০ সালের এই অভিযানে তুরস্ক, পাকিস্তান ও কাতার সরাসরি আজারবাইজানকে সমর্থন দিয়েছে। তাছাড়া আরো কয়েকটি মুসলিম দেশসহ অন্য কিছু দেশও, কারাবাখ যাদের ভূমি তাদের ফেরত দেওয়ার মাধ্যমে দ্বন্দ্ব নিরসনের কথা বলেছে; কিন্তু আর্মেনিয়ার পক্ষে ভারত ও ইউরোপের দুই-একটা দেশ ব্যতীত আর কাউকেই খুব একটা শক্ত অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। অর্থাত্ কারাবাখ ইস্যুতে আর্মেনিয়ার পথচলায় পর্যাপ্ত পরিমাণে বৈশ্বিক সমর্থন লক্ষণীয় ছিল না। উল্লেখ্য যে, রাশিয়ার সঙ্গে আর্মেনিয়ার একটি সামরিক সহায়তা চুক্তি থাকা সত্ত্বেও রাশিয়া জানিয়েছিল, সেটি আর্মেনিয়ার মূল ভূখণ্ডের ভেতরেই প্রযোজ্য। কারাবাখ আর্মেনিয়ার অংশ না থাকার কারণে রাশিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের সহায়তা বা সরাসরি সমর্থন করতে পারেনি।
যাহোক, কারাবাখ নিয়ে ইতিপূর্বে যা ঘটেছে তা কখনোই কাম্য ছিল না। কারণ, যুদ্ধে মৃত্যুবরণকারী উভয় পক্ষের হাজার হাজার তাজা প্রাণ আর কখনোই ফিরে পাওয়া যাবে না। এরকম ঘটনার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ও শক্তিশালী দেশগুলো তাদের ব্যর্থতার চাদর থেকে কখনোই দায় এড়াতে পারবে না। কারণ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এরকম সংঘাত রুখে দেওয়া সম্ভব। সীমানা, ছিটমহল বা ভূমি নিয়ে একে অন্যের সঙ্গে বিরোধ থাকাটা স্বাভাবিকই; কিন্তু তা নিয়ে মানবিক বিপর্যয়ের পর্যায়ে পৌঁছানো কখনোই কাম্য নয়। ভবিষ্যতে পৃথিবীর আর কোথাও যেন এরকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেদিকে ধর্মবর্ণনির্বিশেষে সব দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা কাম্য। সংঘাত নয়, আপস-মীমাংসার মাধ্যমে সমাধান হোক প্রতিটি সমস্যার। শান্তির নীড় হোক পৃথিবীর প্রতি ইঞ্চি জায়গায়, এটাই কামনা।
n লেখক :শিক্ষার্থী, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
