ফলের উত্পাদন ও আমদানি দুটোই বেড়েছে

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০২০, ২২:৪৮

বাজারে ফলের দোকানের পাশাপাশি আজকাল পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে চোখে পড়ে ভ্যানে করে ফল বিক্রির দৃশ্য। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে মানুষের ফল খাওয়ার প্রবণতা আগের চেয়ে বেড়েছে। বর্তমানে দেশে মানুষ দৈনিক ৭৬ গ্রাম ফল খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে; আগে যা ছিল ৫৫ গ্রাম। যদিও পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, সুস্বাস্থ্যের জন্য এক জন মানুষের প্রতিদিন গড়ে ১১৫ গ্রাম ফল খাওয়া প্রয়োজন। মানুষের চাহিদার কারণে একদিকে দেশে ফল উত্পাদন যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে ফল আমদানি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, পাঁচ বছরের ব্যবধানে দেশে ফলের উত্পাদন বেড়েছে প্রায় ২২ লাখ টন। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ফল উত্পাদনের পরিমাণ ছিল ৯৯ লাখ ৭২ হাজার ২৪৭ টন। পাঁচ বছরের ব্যবধানে গত ২০১৮-২০১৯ অর্থবছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ২১ লাখ ৯৩৪ টনে; শতাংশ হিসেবে ২১ দশমিক ৮৫। এরমধ্যে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ কোটি ৬ লাখ ১৮ হাজার টন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১ কোটি ১০ লাখ ৩১ হাজার টন, ২০১৬-১৭  অর্থবছরে ১ কোটি ২০ লাখ ৯৬ হাজার টন ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১ কোটি ২১ লাখ ১৩ হাজার টন ফল উত্পাদন হয়। আগামীতে এই উত্পাদন আরো বাড়বে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।

অন্যদিকে একই সময়ে ফলের আমদানি বেড়েছে ২ লক্ষ ১৬ হাজার ৮৬৪ টন। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ফল আমদানির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৫১ হাজার ২৫৫ টন। পাঁচ বছরের ব্যবধানে গত ২০১৮-২০১৯ অর্থবছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৮৯ টনে; শতাংশের হিসেবে প্রায় ৮৬ শতাংশ। তবে চলতি অর্থবছরের পুরো হিসেব এখনো পাওয়া না গেলেও গত মার্চ-জুন এই চার মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বিদেশি ফলের আমদানি বেড়েছে ১৮ শতাংশ। এরমধ্যে আপেল আমদানি ৪৪ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৮০ হাজার টন হয়েছে। মাল্টা আমদানি হয়েছে ৫২ হাজার টন। আর কমলা, আঙুর, নাশপাতি, ডালিম আমদানি ৯২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৯০৭ টনে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি আপেল আমদানি করে তার মধ্যে বাংলাদেশ তৃতীয়। এ ছাড়া পণ্যের বাজার পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ইনডেক্সমুন্ডির তথ্য অনুযায়ী, মাল্টা আমদানিতে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

বিশেষ করে করোনা সংকটকালীন সময়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দেহের চাহিদা মেটাতে ফল আমদানি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। তবে করোনা পরিস্থিতির আগে একটা সময়ে আমদানি করা ফলের চেয়ে মানুষ তুলনামূলকভাবে দেশি ফলের প্রতি বেশি আগ্রহী হচ্ছিল। কারণ মানুষ এখন বুঝতে পারছে, আমাদের আম, কাঁঠাল, নারকেল, পেয়ারা, পেঁপে, বড়ই, আমড়া, জাম, জাম্বুরা কোনো অংশেই কম নয়। থাই জাতের পেয়ারা, আপেলকুল ভোক্তাদের কাছে দিনদিন তার কদর বাড়াচ্ছে। কিন্তু হঠাত্ করে করোনা সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে আমদানি করা ফলের প্রতি ঝুঁকেছে মানুষ।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দেশেই এখন নতুন জাতের মাল্টা, কমলা, ড্রাগনসহ নানা ধরনের বিদেশি ফলের চাষ হচ্ছে। ফলে ফল আমদানি ভবিষ্যতে কমবে। গত পাঁচ বছরে দেশে প্রায় সব ধরনের ফলের উত্পাদনই বেড়েছে। এরমধ্যে পেঁপে, আমড়া, জাম, কাঁঠাল, নারকেল, মাল্টা ও পেয়ারার আবাদ বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে পেয়ারার আবাদ। গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩ লক্ষ ২৩ হাজার ৯৪৫ টন পেয়ারার আবাদ হলেও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা ৫ লক্ষ ২১ হাজার ৩৩৬ টন ছাড়িয়ে গেছে।  এছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পেঁপে ৮ লাখ ৮০ হাজার ৭২৮ টন, আমড়া ৮২ হাজার ৫৫৩ টন, জাম ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৫৯ টন, কাঁঠাল ১৮ লাখ ৮৬ হাজার ৯৬৪ টন, নারকেল ৬৫ হাজার ৯৩২ টন ও ১৭ হাজার ৩ টন মাল্টা উত্পাদন হয়।

কৃষিবিদরা বলেছেন, আগে সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ মাস দেশি ফলের উত্পাদন কম ছিল। কিন্তু এখন দেশে চাষ হয় এমন কোনো না কোনো ফল সারা বছরই পাওয়া যায়। বর্তমানে সারা বছরজুড়েই মৌসুমি দেশি ফলের পাশাপাশি বারোমাসি ও বিদেশি ফলেরও আবাদ করছেন কৃষকরা। এক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বছরব্যাপী ফল উত্পাদনের প্রকল্প ইতিবাচক প্রভাব রাখছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কৃষির বহুমুখীকরণের সুবাদে বর্তমানে আবাদ প্রবৃদ্ধির দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে ফল ও ফুল। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৮ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশে ফলের আবাদ সম্প্র্রসারণ হয়েছে ১০২ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বছরব্যাপী ফল উত্পাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মেহেদী মাসুদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, গত কয়েক বছর ধরে ফল খাওয়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে।