বাল্যবিবাহের কবলে পড়ে দুঃসহ জীবন

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০২০, ২২:৪৯

মরিয়মের বয়স ১৪ বছর। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তার বিয়ে হয়। এখন সে গৃহবধূ ও এক শিশুসন্তানের মা। কন্যাসন্তান নিয়ে গ্রামীণ সমাজে নেতিবাচক ধারণা থাকায় তাড়াশ উপজেলায় প্রতি বছর মরিয়মের মতো হাজারো মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে।

এদিকে অপরিপক্ব বয়সে বিয়ের কারণে মা ও শিশু উভয়ের মৃত্যুঝুঁকি বহুলাংশে বেড়েছে। অনেকে মা হওয়ার আগেই অথবা পরে অসুস্থতায় ভুগছে। কেউবা স্বামী, সংসার ও পরিবারের সঙ্গে মানিয়ে চলতে না পেরে বাবার বাড়িতে ফিরে এসেছে।

বাল্যবিবাহ তাত্ক্ষণিক বন্ধ করা গেলেও শেষ পর্যন্ত একটি বিয়েও আটকে থাকে না। এটাকেই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও সামাজিক সংগঠনগুলো। তাছাড়া মানুষের মধ্যে আইন না মানার সংস্কৃতিও এ ক্ষেত্রে প্রবল।

মরিয়ম জানান, তখন তিনি বলদিপাড়া দাখিল মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। লেখাপড়ায়ও বেশ মনোযোগী। এরই মধ্যে তাকে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর পরিবারের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের বাইরে তার কিছুই করার ছিল না। এখনো তার বয়স পড়ালেখা করে হেসেখেলে বেড়ানোর। কিন্তু সন্তান লালন-পালন ও সংসারের দায়িত্বভার তারই কাঁধে। মরিয়ম উপজেলার মাধাইনগর ইউনিয়নের কাটাগাড়ী গ্রামের মজনু সরকারের মেয়ে এবং একই গ্রামের খোকন রহমানের স্ত্রী।  

উপজেলার দেশীগ্রাম ইউনিয়নের কাটাগাড়ী আদর্শ গ্রামের নূর হোসেনের মেয়ে বৃষ্টি খাতুনের (১৩) জীবনের গল্পটা আরো নির্মম। বাল্যবিবাহের অভিশাপে সে এখন শারীরিক প্রতিবন্ধী। বৃষ্টি জানায়, বলদিপাড়া দাখিল মাদ্রাসায় সপ্তম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় পাশের দেশিগ্রামের আব্দুল মতিনের ছেলে আব্দুল মমিনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।       কিন্তু কোনোভাবেই সে স্বামী, সংসার ও পরিবারের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারছিল না। স্বামীকে দেখে তার খুবই ভয় লাগত। এ বিষয়টা না কেউ বুঝতে চাইত, না কেউ মেনে নিত! সে ভাবল, এত ভয়ের মধ্যে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো। তাই তো কীটনাশক পানে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। অনেক চিকিত্সার পর প্রাণে বেঁচে গেলেও দুই পায়ের শক্তি হারিয়ে যায়। সে এখন লাঠিতে ভর করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে।

বৃষ্টির মা বাঁচা খাতুন বলেন, দেরিতে হলেও তিনি বুঝতে পারেন, মেয়েকে অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়া মোটেও ঠিক হয়নি। তাই তো জামাই আব্দুল মমিন ও বেয়াই আব্দুল মতিনকে আরো একটু সময় দেওয়ার অনুরোধ করে বৃষ্টিকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। তবে মানতে নারাজ। সপ্তাহ পার না হতেই জামাই চলে আসেন শ্বশুরবাড়িতে। আর ভয়ে মেয়েটি আত্মহত্যা করতে চায়। বৃষ্টির মা আরো বলেন, যার কারণে তার মেয়ের জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, তিনি আবারও বিয়ে করে সংসার করছেন। বৃষ্টির কোনো খোঁজ-খবর নেওয়ারও প্রয়োজন মনে করেন না। বিয়ে নিবন্ধন করা সম্ভব হয়নি বলে আইনি সহায়তাও নেওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে মরিয়মের বাবা মজনু, বৃষ্টির বাবা নুর হোসেন, সুমাইয়ার বাবা রুহুল আমিন, শাহানার বাবা শহিদ উদ্দিন, আমেনার বাবা আবুল হোসেনের মতো অনেকেই মনে করেন, মেয়েদের বয়স বেশি হলে বিয়ে দিতে সমস্যা হয়। পক্ষান্তরে অল্প বয়সি মেয়েদের কম খরচে সহজেই বিয়ে হয়ে যায়। তাছাড়া কন্যাসন্তান পড়ালেখা শিখিয়ে লাভ নেই, তাদের দিয়ে ভিটেমাটিতে বাতি জ্বালানোর কোনো নিশ্চয়তা থাকে না!

সরেজমিন তাড়াশের বারুহাস ইউনিয়নের বস্তুল, তালম ইউনিয়নের চৌড়া, দেশিগ্রাম ইউনিয়নের দেশিগ্রাম, মাধাইনগর ইউনিয়নের সরাপপুর, নওগাঁ ইউনিয়নের কালুপাড়া, মাগুরা বিনোদ ইউনিয়নের হামকুড়িয়া, সগুনা ইউনিয়নের কুন্দইল ও তাড়াশ সদর ইউনিয়নের মাধপপুর গ্রাম ঘুরে জানা যায়, প্রতিটি গ্রামেই বছরে পাঁচ-ছয় জন মেয়ের অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে গেছে। উপজেলার ২৫৬ গ্রাম থেকে পাঁচ জন করে হলেও প্রতি বছর গড়ে ১ হাজার ২৮০ জন মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে।