যুক্তরাষ্ট্রে বিভক্তি মারাত্মক পর্যায়ে: ওবামা

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২০, ০৯:১৪

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, আমেরিকার সামনে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশটিকে পাগলাটে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সংস্কৃতি থেকে উলটোপথে ফেরানো। তার মতে, এসব ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আমেরিকার বিভক্তিকে আরো মারাত্মক করে তুলেছে। 

বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে বারাক ওবামা বলেছেন, চার বছর আগে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন তার চেয়ে আরো বেশি বিভক্ত। ওবামা বলেন, ২০২০ সালের নির্বাচনে জো বাইডেন জয়ী হলেও এই বিভেদ দূর করার কাজ শুরু হয়েছে মাত্র। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রে এই ধারাকে উলটো দিকে ফেরাতে একটা নির্বাচনে জেতা যথেষ্ট নয়, এজন্য আরো অনেক কিছু করতে হবে। তিনি বলেন, চরমভাবে দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়া একটি জাতিকে এক করার কাজটি কেবল রাজনীতিকদের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। এর জন্য দরকার হবে একদিকে অনেক কাঠামোগত পরিবর্তন‌। অপরদিকে মানুষকে একে অন্যের কথা শুনতে হবে। আর যে কোনো বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার আগে কিছু অভিন্ন ‘প্রকৃত সত্যের’ ব্যাপারে একমত হতে হবে। তবে ওবামা বলছেন, তিনি পরবর্তী প্রজন্মের পরিশীলিত দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে একটা বিরাট আশা দেখতে পাচ্ছেন। তিনি তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এই ‘সতর্ক আশাবাদ’ যেন তারা লালন করে। তারা যেন বিশ্বাস করে যে পরিবর্তন আনা সম্ভব এবং তারা যেন সেই পরিবর্তনের অংশীদার হয়।

কীভাবে বিভেদে উসকানি দেওয়া হচ্ছে?

ওবামা তার নতুন প্রকাশিত স্মৃতিগ্রন্থ নিয়ে কথা বলতে বিবিসির আর্টস অনুষ্ঠানকে এই সাক্ষাত্কারটি দিয়েছেন। ওবামা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে শহর এবং পল্লি অঞ্চলের মধ্যে, অভিবাসন এবং অবিচার নিয়ে যে ধরনের অসন্তোষ এবং ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে, যেভাবে নানা রকম ‘মাথা খারাপ’ ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়েছে যাকে অনেকে সত্যের অবক্ষয় বলে বর্ণনা করছেন, তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে কিছু গণমাধ্যম। আর এসবের আরো বেশি ইন্ধন দিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া।

ওবামা বলেন, এই মুহূর্তে আমরা খুবই বিভক্ত, আমি যখন ২০০৭ সালে প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়াই এবং ২০০৮ সালে নির্বাচনে জিতি, সেই সময়ের চেয়ে অনেক বেশি বিভেদ এখন আমাদের মাঝে। বারাক ওবামা বলছেন, এর জন্য অংশত দায়ী ট্রাম্প। কারণ তিনি ইচ্ছে করে এই বিভেদে হাওয়া দিয়েছেন, যা থেকে তিনি রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চেয়েছেন। তার মতে, এ ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় ব্যাপকভাবে দায়ী। এটি হচ্ছে অনলাইনে ব্যাপক অপপ্রচার, যেখানে প্রকৃত সত্য নিয়ে যেন কারো কিছু যায় আসে না।

‘লাখ লাখ মানুষ আছে, যারা বিশ্বাস করে জো বাইডেন একজন সমাজতন্ত্রী। বহু মানুষ আছেন যারা বিশ্বাস করেন হিলারি ক্লিনটন এমন এক গুপ্তচক্রের সদস্য, যারা শিশুদের ওপর যৌন-নিপীড়ন চালায়’, বলছেন ওবামা। ওবামা হিলারির যে উদাহরণটি দিয়েছেন, সেটি এক ভুয়া ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। এতে দাবি করা হয় যে, ডেমোক্রেটিক পার্টির রাজনীতিকরা ওয়াশিংটনের একটি পিত্জা রেস্তোরাঁ থেকে এক ‘পিডোফাইল চক্র’ (শিশুদের যৌন সম্ভোগে আসক্ত ব্যক্তিদের চক্র) পরিচালনা করে। হিলারি এই চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করা হয় এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বে। ‘আমার মনে হয় একটা পর্যায়ে আমাদেরকে কিছু নিয়ন্ত্রণ এবং মানদণ্ডের ব্যাপারে একমত হতে হবে। যাতে করে আমরা আগের সেই অবস্থায় ফিরে যেতে পারি, যেখানে আমরা যে কোনো বিষয়ে তর্কে লিপ্ত হওয়ার আগে অন্তত কিছু অভিন্ন প্রকৃত সত্যের ব্যাপারে একমত হতে পারব’।

ওবামা বলেন, যদিও কিছু মূলধারার গণমাধ্যম অনলাইনে মিথ্যে অপপ্রচার মোকাবিলায় ‘আসল সত্য’ যাচাই করার কাজ শুরু করেছে, সেটা যথেষ্ট নয়। কারণ গণমাধ্যমের আসল সত্য যাচাইয়ের কাজ শেষে সত্য যতক্ষণে দরোজা দিয়ে বের হচ্ছে, মিথ্যা ততক্ষণে গোটা পৃথিবী ঘুরে এসেছে। তিনি আরো বলেন, আমেরিকায় এই বিভেদের পেছনে আছে একই সঙ্গে অনেক আর্থসামাজিক কারণ। যেমন আমেরিকার শহর ও পল্লি অঞ্চলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য।

ওবামা বলেন, এই সমস্যা কেবল আমেরিকার নয়, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের অনেক জায়গাতেই একই ঘটনা ঘটছে। লোকের মনে হচ্ছে, তাদের সামনে থেকে অর্থনৈতিকভাবে উপরে ওঠার সিঁড়িটা যেন সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব লোককে তখন বোঝানো সহজ যে তাদের এই বঞ্চনার জন্য দায়ী হচ্ছে এই বিশেষ গোষ্ঠী বা ঐ গোষ্ঠী।

ওবামার মতে, মার্কিন রাজনীতিতে সবচেয়ে মৌলিক একটি বিভাজন রেখা হচ্ছে বর্ণ বিভেদ। এটি হচ্ছে আমাদের আদি পাপ। ওবামা বিবিসিকে এই সাক্ষাত্কার দেন তার নতুন স্মৃতিগ্রন্থ ‘ অ্যা প্রমিজড ল্যান্ড’ এর প্রকাশনার আগে। কীভাবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে এবং প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, সেটি নিয়ে এই বই। আজ ১৭ নভেম্বর বইটি প্রকাশিত হবে। হোয়াইট হাউজে তার শাসনকাল নিয়ে যে দুটি বই তিনি লিখছেন, এটি হচ্ছে তার প্রথমটি।