দর্শক মুগ্ধ আয়নাঘরে

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২০, ২০:০৩

মা হ বু ব  আ ল ম

 

ভদ্র মহিলা আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদছেন। পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন কয়েকজন নারী-পুরুষ। দেখে মনে হলো তারা একই পরিবারের সদস্য। ঘটনা কী? নাটক দেখতে এসে তিনি কাঁদছেন কেন? কেউ কি তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে? অথবা কোনো দুঃসংবাদ পেয়েছেন? এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কাঁদছেন কেন? ভদ্র মহিলা আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এবার জোরে কেঁদে ফেললেন। রহস্যটা যেন আরও ঘনীভূত হলো! ভদ্রমহিলার পাশে যারা দাঁড়িয়ে আছেন তাদের মধ্য থেকে একটি মেয়ে বলল, নাটক দেখার পর উনি কাঁদছেন।

কেন, কেন? কাঁদছেন কেন? আমার প্রশ্ন শুনে মেয়েটি যেন একটু বিব্রত হলো। তবে সেটা বুঝতে না দিয়ে বলল, নাটকের কাহিনি মাকে খুব স্পর্শ করেছে। নাটকের একটি চরিত্রের সঙ্গে আমার ছোট ভাইয়ের চরিত্র মিলে গেছে। তাই দেখে মা কাঁদছেন। এর বেশী আর কথা হলো না। ভদ্রমহিলার কান্না দেখে অনেকেই ‘কারণ কী’ জানার জন্য ভীড় করতে শুরু করেছে। মেয়েটি সহ তার পরিবারের লোকজন ভদ্রমহিলাকে নিয়ে শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল হল থেকে বেরিয়ে গেল। তখনই কথা হলো ডেফোডিল কলেজের অধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব) জহিরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনিও নাটকটি দেখেছেন। অভিভূত কণ্ঠে বললেন, আমাদের কলেজের অভিভাবকদেরকে আমরা নাটকটি দেখাতে চাই। কীভাবে সম্ভব? কার সঙ্গে কথা বলব? আমি যারপর নাই অবাক। এমনিতেই মঞ্চ নাটকের প্রতি দর্শকের আগ্রহ কম। তার ওপর করোনার আতঙ্ক তো রয়েছেই। এই পরিস্থিতিতেও শিল্পকলার বড় হলে নাটক দেখতে এসেছেন কয়েকশ দর্শক। স্বাস্থ্যবিধি মেনে হলের আসন বিন্যাস করায় আসন সংখ্যা কমে গেছে। সে কারণে নাটক দেখতে আসা অনেক দর্শক ফিরে গেছেন। এই নিয়ে যখন ভাবছি তখনই দুটি ঘটনার মুখোমুখি হলাম। নাটক দেখে একজন মা কাঁদছেন। একটি কলেজের অধ্যক্ষ তার কলেজের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদেরকে নাটকটি দেখাতে চান! সত্যি বলতে কি মঞ্চ নাটকের জন্য এটি শুভ সংবাদ।  এজন্য প্রশংসা প্রাপ্য এথিক নাট্যদলের। দলটির ৮ম প্রযোজনার নাম— আয়নাঘর। রেজানুর রহমানের রচনা ও নির্দেশনায় মঞ্চের এই নতুন নাটকটি উদ্বোধনী দিনেই দর্শকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। নাটক দেখতে আসা অতিথিদের মধ্যে সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী, নাট্যজন আসাদুজ্জামান নূর এমপি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী আলী, দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক সাইফুল আলম, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল কামাল বায়োজীদ ‘আয়নাঘর’র  প্রশংসা করলেন। তাদের অভিন্ন বক্তব্য— নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে ‘আয়নাঘর’ প্রেরণা হতে পারে। নাটকটি পরিবারের সকলেরই দেখা উচিত।  আমরা অনেকেই ভাবি সম্পর্ক দূরত্বের কারণে শেষ হয়—এটা পুরোপুরি সত্য নয়। সম্পর্ক দূরত্বের কারণে শেষ হয় না। সম্পর্ক শেষ হয় অসম্মান, অহংকার, স্বার্থপরতা আর বিশ্বাসঘাতকতার কারণে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার থেকে পরিবারের সম্পর্কগুলো এভাবেই নষ্ট হতে থাকে। নাটকের কাহিনিতে একটি পরিবারের জীবনচিত্র ওঠে এসেছে। পারস্পরিক মায়ার বন্ধনে অটুট একটি পরিবার। হঠাত্ ধর্ষণের মতো একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনার কারণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় পরিবারটির বন্ধন। তারপর ঘটতে থাকে অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক ঘটনা! এই হলো মোটামুটি আয়নাঘরের সংক্ষিপ্ত কাহিনি। এতে অভিনয় করেছেন রেজানুর রহমান, মাহবুবা রেজানুর, কাজী প্যারিস, সুমনা সোমা, সূকর্ণ হাসান, মিন্টু সরদার, ইমতিয়াজ আসাদ, সবুজ রহমান, মনি কাঞ্চন ও নূর সাবা। এথিক সূত্রে জানা গেছে চলতি মাসেই নাটকটির দ্বিতীয় প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে।