বৈশ্বিক মহামারি করোনার ছোবলে পুরো পৃথিবী পর্যুদস্ত। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক—প্রায় সবক্ষেত্রেই করোনার অভিঘাত দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। বিশ্বমন্দা-২০০৮-এর পর বিশ্ব অর্থনীতি এত ভয়াবহতার মুখে পড়েনি। বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও এই ঢেউ লেগেছে। ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বিগত কয়েক দশকে বিশ্ব শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অভিবাসন, অর্থনীতি দারিদ্র্যের হার হ্রাস—প্রভৃতি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। গত এক দশকে অনেক উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশও দারিদ্র্যের হার হ্রাসে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে।
করোনা ভাইরাস আমাদের অর্থনীতিকে ব্যাপক বির্পযয়ের মুখে ফেলে দিয়েছে। এতদিন ধরে দারিদ্র্যবিমোচনের প্রক্রিয়া যে সফলভাবে চলছিল তা করোনার কারণে ধাক্কা খেয়েছে। দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়ার বদলে এই ভয়াল দৈত্যের থাবায় আবদ্ধ হচ্ছে প্রতিদিনই বিপুলসংখ্যক মানুষ। করোনার প্রভাবে গৃহকর্মী থেকে শুরু করে রিকশাচালক, কারখানার শ্রমিক, ক্ষুদ্রব্যবসায়ী পেশার মানুষ কাজ হারিয়েছে। কাজ হারিয়ে জীবন নির্বাহের তাগিদে শহর ছাড়ছে অনেকেই। বেসরকারি সংস্থা বিয়াইজিডি ও পিপিআরসির জরিপ বলছে, করোনাকালে রাজধানী ছেড়ে চলে গেছে ১৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ মানুষ। শিক্ষার খরচ, চিকিত্সার খরচ, বাড়িভাড়া ও যোগাযোগের ব্যয় সামলাতে না পেরে এসব মানুষ গ্রামমুখী হচ্ছে। আয় কমছে। ব্যয় বাড়ছে। অনেকেই নিজের সঞ্চয় ভাঙিয়েও জীবন নির্বাহ করতে হিমশিম খাচ্ছে।
করোনার পূর্বে প্রায় সবাই তিনবেলা খেতে পারত; কিন্তু করোনার সময়ে এক বেলা এবং দুই বেলায় নেমে এসেছে। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ ডিম, দুধসহ অন্যান্য পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পর্যাপ্ত খাবারের অপ্রতুলতা ও ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে চরম উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠা। যা শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।
বিশাল এক জনগোষ্ঠী কাজ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে গেছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ নিজেদের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য দিশেহারা হয়ে গেছে। সরকার দারিদ্র বিমোচনের সাফল্য ধরে রাখার নিমিত্তে বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করলেও তার সঠিক বাস্তবায়ন নিয়ে রয়েছে সন্দেহ ও অনিশ্চয়তা। যেহেতু করোনার অভিঘাতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সেহেতু সঠিক উদ্দীপনা প্যাকেজের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
সার্বিকভাবে ইতিমধ্যে দৃশ্যমান সংকটসমূহকে চিহ্নিত করে তা থেকে উত্তরণের রূপরেখা বাস্তবায়ন করা জরুরি। দারিদ্র্যবিমোচনের সাফল্যকে ম্লান করার পেছনে যেসব অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে তা কাটিয়ে উঠে দারিদ্র্যবিমোচনের সাফল্য অব্যাহত রাখার জন্য সুসংহত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার সঠিক বাস্তবায়ন জরুরি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
